Thursday, April 4, 2013

Laws of War and Its Development

যুদ্ধ আইনের বিবর্তন ও অগ্রগতির সংক্ষিপ্ত বিবরণ 

 ভূমিকা

যুদ্ধ
 প্রাচীনকালে যুদ্ধের জন্যে সুস্পষ্ট কোন সম্মত নীতিমালা ছিল না। সৈন্যবাহিনী যুদ্ধ জয়ের জন্যে যেকোন ব্যবস্থা নেবে এবং যুদ্ধের শেষে পরাজিত সৈন্যদের ও সেই দেশের জনগণকে কচুকাটা করবে বা দাস হিসেবে আয়ত্ব করবে, এটাই ছিল স্বাভাবিক। ইহুদী গ্রন্থ প্রাচীন টেস্টামেন্টে সর্ব প্রথম নির্দেশনা হিসেবে যুদ্ধের সময় ফলবান বৃক্ষরাজি ধ্বংস না করার নীতি পাওয়া যায়। চতুর্থ শতাব্দিতে রোম অধিবাসী ক্রিস্টান ধর্মগুরু অগাস্টিন (Saint Augustine 354–430 A.D.) সর্ব প্রথম ন্যায় যুদ্ধের ধারণার অবতারণা করেন। পরবর্তীতে ইসলামের অভ্যুদয়ের সাথে যুদ্ধ আইনের ধারা কিছুটা উন্নতি লাভ করে। সুরা আল বাকারায় উল্লেখ করা হয় যে যুদ্ধে একজন মুসলমান আত্মরক্ষার্থে পাল্টা আঘাত হানবে, তবে শত্রু আক্রমণ বন্ধ করলে মুসলমানরা তাদের উপর আক্রমণ করা থেকে বিরত থাকবে। (আয়াত নং ১৯০-১৯৩)। সপ্তম শতকে খলীফা আবু বকর যুদ্ধের জন্যে যে দশটি আদেশ (এ নিয়ে কিছুটা মতান্তর আছে) দেন তা যুদ্ধ নীতিমালায় বড় ধরণের সংযোজন। তিনি যুদ্ধে প্রতারণার কৌশল নিষিদ্ধ করেন, শত্রুর লাশকে অসম্মান না করা, শিশু, নারী ও বৃদ্ধলোককে হত্যা নিষিদ্ধ করেন। ফলবান গাছ ধ্বংস না করারও নির্দেশ প্রদান করেন। তবে যুদ্ধপরাধের ধারণার উদ্ভবে সবচেয়ে সহায়ক ছিল আমেরিকার সৈন্যদের জন্য ১৮৬৩ সালে ফ্রান্সিস লিবার প্রণীত নির্দেশাবলী যা ইতিহাসে লিবার কোড নামে খ্যাত। লিবারকোড আন্তর্জাতিক আইন ছিল না, এর প্রয়োগ ছিল আমেরিকার সৈন্যদের মাঝে সীমাবদ্ধ। মধ্যযুগের যুদ্ধবিষয়ক এইসব নীতি ছিল যুদ্ধ পরিচালনার নীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ। প্রায় একই সময়ে হেনরি ডুনান্ট (Henry Dunant) যুদ্ধকালীন আহত সৈন্যদের সেবা প্রদানের জন্যে উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং তাঁর ব্যাক্তিগত উদ্যোগ আন্তর্জাতিক উদ্যোগে পরিণত হয় ১৮৬৩ সালে রেডক্রস প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে।
হেনরি ডুনান্ট
 ১৮৬৪ সালে রেডক্রসের চাপে সুইস সরকার আরো ১১টি দেশের প্রতিনিধি নিয়ে জেনেভা শহরে এক সন্মেলনে মিলিত হন, ঐ সন্মেলনে উপস্থিত দেশগুলো একটি চুক্তিতে উপনীত হয়। ঐ চুক্তি হচ্ছে ১ম জেনেভা কনভেনশন, যা "Geneva Convention for the Amelioration of the Condition of the Wounded in Armies in the Field" হিসেবে পরিচিত। ১ম জেনেভা কনভেনশনই হচ্ছে বিশ্বের ইতিহাসে যুদ্ধ আইন (যা International Humanitarian Law হিসেবে পরিচিত) ভিত্তিক প্রথম লিখিত আন্তর্জাতিক চুক্তি। ২য় জেনেভা কনভেনশন স্বাক্ষরিত হয় ১৯০৬ সালে। এর আগে ১৮৯৯ সালে রাশিয়ার জার ২য় নিকোলাস-এর উদ্যোগে হেগ কনভেনশন  স্বাক্ষরিত হয়। হেগ কনভেনশনে বিবাদমান দেশসমূহের মধ্যে বিরোধ মীমাংসার জন্যে একটি স্থায়ী আদালত (Permanent Court of Arbitration) স্থাপন,  ৬০ আর্টিকল বিশিষ্ঠ স্থলযুদ্ধের আইন ও প্রথা, ১৮৬৪ সালের নৌযুদ্ধ সংক্রান্ত জেনেভা কনভেনশন ছাড়াও বেলুন থেকে বিস্ফোরক ছোড়া, হত্যার জন্যে গ্যাস ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। হেগ কনভেনশন ১৮৯৯ জার্মানী, ইটালি, জাপানসহ বিশ্বের বড় বড় দেশগুলো রেটিফাই করায় এই কনভেনশন তাদের উপর আরোপযোগ্য ছিল। ১৯০৯ সালে হেগ কনভেনশনের আইনগুলো পুনর্মূল্যায়ন করার সময় আর্জেন্টিনা, চিলি, গ্রিস, ইটালি, কোরিয়া, বুলগেরিয়া, কলম্বিয়া, ইকুযেডর, গ্রিস, মন্টিনিগ্রো, প্যারাগুয়ে, পারস্য, পেরু, সার্বিয়া, স্পেন, তুরস্ক, উরুগুয়ে ও ভেনজুয়েলা মোট ১৭ দেশ সংশোধিত আইনগুলো রেটিফাই করতে অস্বীকার করলেও তাদের রেটিফাইকৃত পূর্ব কনভেনশন মানার বাধ্যতা তাদের উপর বলবৎ থেকে যায়। তবে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মান, ফ্রান্স, ইটালি, জাপান, চীন, রাশিয়া ইত্যাদি দেশগুলো ১৯০৬ সালের হেগ কনভেনশন রেটিফাই করেছিল। ১৯০৬ সালের হেগ কনভেনশনের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন ছিল একটি সালিশ আদালত প্রতিষ্ঠা। আমেরিকা, বৃটেনসহ কয়েকাটি দেশ বাধ্যতামূলক সালিশ আদালত প্রতিষ্ঠার জন্যে কনভেনশনে চেষ্টা চালায়। কিন্তু তা সফল না হলেও সালিশ সংক্রান্ত একটি চুক্তি (Pacific Settlement of International Disputes (Hague I); October 18, 1907) কনভেনশনে গৃহীত হয়। উল্লেখ্য যে, ১৮৯৯ ও ১৯০৬ সালের হেগ কনভেনশনে যুদ্ধের আইন বা নিয়ম কানুন সম্পর্কে বিস্তারিত উল্লেখ থাকলেও তাতে যুদ্ধপরাধ বা যুদ্ধপরাধের বিচারের কোন ধারণার উন্মেষ ছিল না।  যুদ্ধপরাধের ধারণার উদ্ভব ঘটে বিশ শতকের গোড়ার দিকে ১ম বিশ্বযুদ্ধের সময়।

 বিশ্বযুদ্ধ

১ম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গের জন্যে ফৌজদারি অপরাধের দায়ে বিচারের ধারণার জন্মদান করে মিত্র বাহিনী। ১৯১৮ সালের ১১ নভেম্বর সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে ১ম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির পর ১৯১৯ সালের ২৮ জুন সম্পাদিত হয় জার্মানীর আত্মসমর্পনের চূড়ান্ত দলিল  ভার্সাই চুক্তি
 ঐ চুক্তির ভার্সাই চুক্তির ২২৭ থেকে ২৩০ অনুচ্ছেদে মিত্র বাহিনী কর্তৃক যুদ্ধপরাধের দায়ে জার্মানদের বিচারের শর্ত অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যুদ্ধপরাধের প্রধান লক্ষ্য ছিলেন জার্মানের সম্রাট বা কাইজার ২য় উইলিয়াম। কাইজার উইলিয়াম বিচার এড়াতে আশ্রয় নেন হলান্ডে। প্যারিস শান্তি সন্মেলনের সভাপতি ১৯৯১ সালের ২৮ জুন তারিখে কাইজার উইলিয়ামকে বিচারের জন্যে ফেরৎ দেবার অনুরোধ জানিয়ে হলান্ড সরকারকে পত্র প্রেরণ করলে, ৭ জুলাই হলান্ড সাফ জানিয়ে দেয় যে তাদের পক্ষে নিরপেক্ষতার নীতি ভঙ্গ করে উইলিয়ামকে প্রত্যর্পণ করা সম্ভব নয়। ফলে কাইজার ২য় উইলিয়ামকে বিচারের বিষয় চাপা পড়ে যায়। ১৯২০ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি তারিখে মিত্র পক্ষ জার্মান সরকারের নিকট ৮৯০ জনের নাম দিয়ে তাদের যুদ্ধপরাধের বিচারের জন্যে তাদের প্রত্যর্পন দাবি করে। কিন্তু এতে সম্মত হয়নি জার্মান সরকার। তবে জার্মান সরকার জানায় যে তাদের দেশের বিচার ব্যবস্থায় যুদ্ধপরাধের বিচার করা যেতে পারে। মিত্রপক্ষ জার্মানদের ঐ প্রস্তাবে রাজী হয়ে ১৯২০ সালর মে মাসে আগের চেয়ে অনেক সংক্ষিপ্ত তালিকা দিয়ে জার্মান বিচার ব্যবস্থার মধ্যে তাদের বিচারের অনুরোধ জানায়। তবে সাক্ষ্য প্রমানের অভাবে ১৯২১ সালে মাত্র ১২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে বিচারের সম্মুখীন করা হয়। বিচার পরিচালিত হয় লাইপজিগে অবস্থিত জার্মান সুপ্রিম  (German Reichsgericht) কোর্টে ভার্সাই চুক্তির শর্তাধীনে।
জার্মান সুপ্রীম কোর্ট, লাইপজিগ

উল্লেখযোগ্য যে ১৯১৫ সালে অটোমান তুর্কীদের বিরুদ্ধে লক্ষ লক্ষ আর্মেনিয়ানদের হত্যার জন্যে বিচারের হুমকি দিয়েছিল বৃটেন। কিন্তু তুরস্কে গৃহযুদ্ধ বেঁধে যাওয়ার পর কামাল আতাতুর্ক ক্ষমতাসীন হন। কামালের জাতীয়তাবাদিদের হাতে বন্দী হন বৃটেনের অনেক সৈন্য। ফলে ১৯২১ সালে আর্মেনিয়ায় গণহত্যার সাথে জড়িত থাকার সন্দেহভাজন ৩৬ জন তুর্কি যুদ্ধবন্দীকে মুক্তি দিয়ে অবমাননাকর বন্দী বিনিময়ে সম্মত হতে হয় বৃটেনকে। ফলে আর্মেনিয়ায় তুর্কি বাহিনীর নৃশংসতা চাপা পড়ে ইতিহাসের পাতায়।

 লাইপজিগ যুদ্ধপরাধ বিচার

লাইপজিগ যুদ্ধপরাধ বিচার কোন আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় অনুষ্ঠিত হয়নি। জার্মানদের নিজস্ব বিচার ব্যবস্থার অধীনে জার্মান বিচারকদের দ্বারা অভিযুক্ত জার্মানদের বিচার অনুষ্ঠিত হয় জার্মান সুপ্রিমকোর্টে। এ বিচারের উৎস ছিল ভার্সা্ই চুক্তি বা অক্ষশক্তির আত্মসমর্পনের চূড়ান্ত দলিলে অন্তর্ভূক্ত ২২৭ থেকে ২৩০ অনুচ্ছেদের শর্তাবলী। ১৯২১ সালের ২৩ মে থেকে ১৬ জুলাই অবধি জার্মানির লাইপজিগ শহরে এই বিচার কার্য অনুষ্ঠিত হয়। শুরুতে মামলার সংখ্যা ছিল ৪৫। ফ্রান্স ১১টি, বেলজিয়াম ১৫টি, বৃটেন ৭টি এবং ইটালি, পোলান্ড, রোমানিয়া, যুগোস্লাভিয়া ১২টি অভিয়োগ দাখিল করেছিল জার্মানদের বিরুদ্ধে। বেশিরভাগ অভিযোগ ছিল যুদ্ধবন্দীদের বিরুদ্ধে নির্যাতন সংক্রান্ত। যুদ্ধবন্দীদের নির্যাতন ছাড়া সমুদ্রযুদ্ধে নৌসেনাদের অন্যায়ভাবে হত্যার অভিযোগ এনেছিল বৃটিশরা, এ্যানডেনে সেইলেসে (Andenne-Seilles) ২৬২ জন বেসামরিক লোকজন হত্যার অভিযোগ এনেছিল বেলজিয়াম। ফ্রান্সের অন্যতম অভিযোগ ছিল মেজর জেনারেল স্টেংগারের বিরুদ্ধে ১৯১৪ সালের আগস্টে লরেইনে (Lorraine) ফ্রান্সের বন্দী সৈন্যদের হত্যার আদেশে দেয়ার জন্যে। এছাড়াও ছিল ৫৫ জন অধিবাসীসহ নমইনি (Nomeny) -এর ধ্বংস সাধনের।
১ম বিশ্বযুদ্ধে বিধ্বস্থ নমইনি

লাইপজিগ যুদ্ধপরাধ আদালতের প্রধান বিচারপতি ছিলেন ড. কার্ল স্মিথ (Dr Karl Schmidt) এবং রাইখের প্রধান প্রসিকিউটর ছিলেন ড. লুডভিগ এমবার মায়ার (Dr Ludwig Ebermayer)। আদালতে প্রথমেই  বৃটিশদের দায়ের করা ৭টি অভিযোগ বিবেচনায় আনা হলে, অভিযোগসমূহের মধ্যে ৩টিতে অভিযুক্তের অনুপস্থিতির দরুণ তাদের বিরুদ্ধে বিচার পরিত্যক্ত হয়। বাকী ৪টি মামলার মধ্যে ৩টিতে যুদ্ধবন্দীদের উপর নির্যাতনের জন্যে ৩জন নিম্নপদস্থ সেনা কর্মকর্তাকে নামমাত্র সাজা দেয়া হয়। তবে জাহাজডুবির পর লাইফবোটে থাকা সৈন্যদের উপর গুলি চালানোর অভিযোগে দুজন সেনা কর্মকর্তাকে ৪ বছর (মতান্তরে ৯ বছর) করে কারাদন্ডের আদেশ দেয় আদালত। অপরাধের তুলনায় এক্ষেত্রে শাস্থির মাত্রা কম হলেও এ রায়ে মোটামোটি সন্তোষ্ঠ হয় বৃটিশরা। বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, ফ্রান্স ও বেলজিয়ামের মামলাগুলোকে গুরুত্বহীন করা এবং শক্তি হিসেবে বৃটিশকে সন্তোষ্ঠ রাখার জন্যেই সমুদ্র-যুদ্ধ মামলায় তুলনামূলকভাবে বেশি শাস্তি দিয়েছেন জার্মান বিচারকরা। বেলজিয়াম ও ফ্রান্সের অভিযোগ বিচারের ক্ষেত্রে জার্মানদের এ মনোভাব অনেকটাই প্রকট ছিল। ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ চালানোর অভিযোগে স্বীকারোক্তি দেয়ার জন্যে ১২ বছরের এক বালককে নির্যাতনের বেলজিয়ামের অভিযোগ আদালত এই বলে খারিজ করে দেয় যে ঐ বয়সের কিশোরের সাক্ষ্য আদালতে গ্রহণযোগ্য নয়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে বেলিজয়াম আদালতের কার্যক্রম বর্জন করে ফিরে যায়। এরপর আনডেনে (Andenne ) হত্যাযজ্ঞসহ বেলজিয়ানদের অন্যান্য অভিযোগ অনিস্পন্ন থেকে যায়।
ফ্রান্সের অভিযোগসমূহ বিবেচনায় নেয়া হয় ২৯ জুন থেকে ৯ জুলাই ১৯২১ তারিখ পওর্যন্ত। প্রথমেই শুনানি হয় লে. জেনারেল কার্ল স্টেনগারের বিরুদ্ধে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল যে তিনি ১৯১৪ সালের আগস্টে লরেইনে যুদ্ধ চলাকালে জার্মান ৬ষ্ঠ আর্মির ৫৮ পদাতিক বিগ্রেডকে যুদ্ধাহত ফরাসি বন্দীদের হত্যার আদেশ দিয়েছিলেন। এ অভিযোগের স্বপক্ষে জার্মান কয়েকজন সৈনিকও স্বাক্ষ্য দিয়েছিলেন। কিন্তু জার্মানদের কাছে স্টেনগার ছিলেন বিশ্বযুদ্ধে পা হারানো জাতীয় বীর। আদালত তাকে নির্দোষ ঘোষণা করে, স্টেনগারের অধীনস্ত ও তার বিরুদ্ধে স্বাক্ষ্যদানকারি সেনা কর্মকর্তা ক্রসিয়াসকে অপরাধী সাব্যস্থ করে তাকে ২ বছর ৬ মাসের কারাদন্ড আরোপ করেন। স্টেনগারের বেকসুর খালাসপ্রাপ্তিতে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয় ফ্রান্স। ৮ জুলাই ফ্রান্সের প্রতিনিধিরা জার্মানী ত্যাগ করে ফিরে যায় নিজ দেশে,এবং সেখানে তারা জার্মানদের অনুপস্থিতিতে বিচারের জন্যে গঠন করে সামরিক আদালত।
লাইপজিগ আদালতের বিচারে যাদের শাস্থি দেয়া হয়, তাদের মধ্যে, ক্যাপ্টেন এমিল মূল্যার, সার্জেন্ট কার্ল হাইনেন, সৈনিক রবার্ট নিউম্যানকে যুদ্ধবন্দীদের সাথে দুর্বব্যহার করার জন্যে প্রত্যেককে ৬ মাস, ফ্রান্স যুদ্ধবন্দীদের নির্যাতনের জন্যে বেনো ক্রুসিয়াসকে দুবছর ছয় মাস, ভাসমান হাসপাতাল জাহাজ ইউবোট দিয়ে ডুবিয়ে দেয়ার পর লাইফবোটে থাকা লোকজনদের হত্যার দায়ে লুডবিগ ডিথমার ও জন বোল্ডটকে চার বছরের কারাদন্ড দেয়া হয়। লে. ক্যাপ্টেন কার্ল নিউম্যান, লে. জেনারেল কার্ল স্টেনগার, ১ম লে এডলফ লাউল, লে. জেনারেল হান ফন স্কাক ও মে. জেনারেল বেনো ক্রুসকার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ না হওয়ায় তারা বেকসুর খালাস প্রাপ্ত হন। লাইপজিগের এই বিচার ইতিহাসের পাতায় বিতর্কিত হয়ে আছে। এ বিচারে বিচার প্রার্থী, বিচারকারি এবং বিচারের সম্মুখীন, কেউ সন্তোষ্ঠ হতে পারেনি। জার্মান থেকে এমন অভিযোগও ওঠে যে একই অপরাধে মিত্রপক্ষের অনেকেই অভিযুক্ত থাকা সত্বেও তাদের বিরুদ্ধে সামান্যতম ব্যবস্থা নেয়া দূরে থাক, তাদেরকে পুরস্কৃত করা হয়েছে পদোন্নতিসহ বিভিন্ন উপায়ে। তবে লাইপজিগ যুদ্ধপরাধ ট্রায়াল বিতর্কিত হওয়া সত্বেও এ বিচারের মধ্য দিয়ে যুদ্ধপরাধ যে একটি বিচারযোগ্য আন্তর্জাতিক ফৌজদারি অপরাধ তা প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হয়, যার প্রতিফলন ঘটে পরবর্তী ২য় বিশ্বযুদ্ধে।


২য় বিশ্বযুদ্ধ


২য় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয় ১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর জার্মানি কর্তৃক পোলান্ড আক্রমণের মাধ্যমে। পরবর্তী কয়েক বছরের মধ্যে জার্মান নেতৃত্বাধীন ইউরোপিয় অক্ষ শক্তি (জার্মান, ইটালি, আলবেনিয়া, বুলগেরিয়া, হাঙ্গেরি, এবং রোমানিয়া) ফ্রান্স, বেলজিয়াম, লুক্সেমবার্গ, ডেনমার্ক, নরওয়ে, গ্রিস, যুগোশ্লাভিয়া, চেকোশ্লাভিয়া, ফিনল্যান্ড এবং নেদারল্যান্ড দখল করে নেয়। জাপান অক্ষশক্তিতে যোগদান করে ১৯৪১ সালের ডিসেম্বরে। অক্ষশক্তির বিপরীতে বৃটেন ও বৃটেনের কমনওয়েলথ, আমেরিকা, রাশিয়া, ফ্রান্স, চীন, ব্রাজিল, ইথিওপিয়া, মেক্সিকো এবং অক্ষশক্তির দখলকৃত রাষ্ট্রসমূহ মিলে গঠন করে মিত্র শক্তি। ১৯৩৯ থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে যুদ্বের বিস্তার ঘটে সারা ইউরোপে এবং ১৯৪১ সাল পর্যন্ত অক্ষশক্তির জয়রথ দুর্বার বেগে অগ্রসর হতে থাকে। ১৯৪১ থেকে ১৯৪২ সালের মধ্যে যুদ্ধ বিস্তৃত হয় বিশ্বব্যাপী। ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত অক্ষশক্তি বিশ্বব্যাপী তার দাপট অক্ষুন্ন রাখতে পারলেও ১৯৪৪ সাল থেকে মিত্রশক্তিকে ঠেকানো দায় হয়ে পড়ে। মিত্রশক্তি ক্রমাগত জয়লাভ করতে থাকে বিশ্বের বিভিন্ন ফ্রন্টে। ১৯৪৩ সালে ৪ জুলাই জার্মান রাশিয়া আক্রমণ করে যে ভুলের বীজ বপন করে, এর পরিণতিতে তাকে চরম পরাজয়ের সম্মুখীন হতে হয়। ১৯৪৫ সালের ৮ মে তারিখে জার্মান মিত্রশক্তির নিকট শর্তহীন আত্মসমর্পন করে। অপরদিকে ১৯৪৫ সালের ২৬ জুলাই যুক্তরাষ্ট্র জাপানের হিরোশিমা ও ৯ আগস্ট নাগাসাকি শহরে আনবিক বোমা বর্ষণ করলে, জাপান যুদ্ধের ভয়াবহতা অনুধাবন করে আত্মসমর্পন করে ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট তারিখে এবং সেই সাথে সমাপ্ত হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।
হিরোশিমা শহরে আনবিক বোমার বিস্ফোরণ
এ যুদ্ধে অংশ নেয় প্রায় ১০ কোটি সৈন্য, সমস্ত অর্থনৈতিক, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ও বৈজ্ঞানিক শক্তিসহ সামরিক-বেসামরিক সকল সম্পদ ও শক্তি নিয়োজিত করতে হয় যুদ্ধমান দেশগুলোকে। এ্ই যুদ্ধে বিশ্বের প্রায় ৬ কোটিরও অধিক লোক মৃত্যুবরণ করে যার মধ্যে সামরিক বাহিনীর সদস্য সংখ্যা প্রায় ২ কোটি। যুদ্ধে  এককভাবে জার্মান  সামরিক বাহিনীর প্রায় ৫৫ লক্ষ সৈন্য এবং ৩৫ লক্ষ বেসামরিক লোক মৃত্যু বরণ করে। (J. W. Smith,The World's Wasted Wealth 2: Save Our Wealth, Save Our Environment, Instittute for Economic Democracy, Press, 1994, CA, USA,)। ২য় বিশ্বযুদ্ধের হলোকাস্ট (Holocaust) এবং আনবিক বোমায় বিপুল সংখ্যক নিরস্ত্র জনগণের মৃত্যুর মতো অভাবনীয় ঘটনারও অবতারণা ঘটে। ইউরোপে বসবাসরত প্রায় ৯ কোটি ইহুদির মধ্যে প্রায় ৬ কোটি ইহুদি কেবলমাত্র ধর্মবিশ্বাসের কারণে জার্মান সরকারের পরিকল্পিত হত্যালীলার শিকার হয় এবং মিত্রপক্ষের প্রধান শরিক আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক অনাবশ্যকভাবে নিক্ষিপ্ত আনবিক বোমায় মাত্র ২ দিনে হিরোশিমা শহরের প্রায় ১ লক্ষ ৬৬ হাজার এবং নাগাসাকিতে ৮০ লক্ষ লোক প্রাণ হারায়। মৃত্যু, ধ্বংসলীলা, অত্যাচার-উৎপীড়ন, ক্ষুধা-দুর্ভিক্ষ, পরিকল্পিত হ্ত্যাকান্ড, হত্যাকান্ডের জন্যে গ্যাস ও আনবিক শক্তির ব্যবহারসহ বিভিন্ন কারণে ২য় বিশ্বযুদ্ধ তাই সভ্য মানুষের নিকট বিবেচিত হয় মানবেতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ যুদ্ধ হিসেবে।

  নূরেনবার্গ ট্রায়াল

 অক্ষশক্তির আত্মসমর্পনের মধ্য দিয়ে ২য় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটলেও, থার্ড রাইখ (১৯৩৩ সালের ৩০ জানুয়ারি থেকে ১৯৪৫ সালের ৮ মে পর্যন্ত নাজি শাসনকালকে থার্ড রাইখ হিসেবে অভিহিত করা হয়) যুদ্ধ চলাকালে অত্যাচার, উৎপীড়ন ও ধ্বংসযজ্ঞের এক স্থায়ী ছাপ রেখে যায় বিশ্বে। ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল এবং দেশ দখলের কালে অক্ষশক্তি মিত্রপক্ষের সামরিক বেসামরিক মানুষের উপর যে অমানুষিক অত্যাচার নির্যাতন চালায়, শহর-নগর-বন্দর ধ্বংসে যে অভাবনীয় শক্তি প্রয়োগ করে, ৯ কোটি ইহুদির মধ্যে যে প্রক্রিয়ায় প্রায় ৬ কোটি ইহুদিকে হত্যা করে, সেইসব ঘটনাসহ অন্যান্য অপরাধমূলক কার্যের বিচারের প্রশ্ন যুদ্ধ শেষে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে। ১৯৪৩ সালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ফ্রাংকলিন ডি রুজভেল্ট, বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনিস্টন চার্চিল এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রধানমন্ত্রী জোসেফ স্টালিন মস্কো চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকেই অক্ষশক্তির বিরুদ্ধে তাদের নৃশংসতা, গণহত্যা, রক্তহিমকরা নির্বিচার হত্যার বিচারের বিষয়টি উঠে আসে আলোচনায়। এসব অপরাধের প্রতি হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলা হয় যে বিশ্বের যেকোন প্রান্তেই তারা থাকুক না কেন তাদেরকে দাঁড়াতে হবে বিচারের কাঠগড়ায়। ১৯৪৫ সালে ইয়াল্টা শীর্ষ সন্মেলনে স্বাক্ষরিত চুক্তির ৬ষ্ঠ অনুচ্ছেদেও শীর্ষ যুদ্ধপরাধীদের বিরুদ্ধে তদন্তের কথা উল্লেখ করা হয়।
ইয়াল্টা সন্মেলন
১৯৪৪ সালে রুজভেল্ট ও চার্চিল কোন বিচার বা আইনানুগ ব্যবস্থা ব্যাতিরেকেই থার্ড রাইখের শীর্ষস্থানীয় ব্যাক্তিদের সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিতে শাস্তি দেয়ার চিন্তাভাবনা করছিলেন।  তবে ১৯৪৫ সালের জুন মাসে লন্ডনে অনুষ্ঠিত সামরিক আদালতে বিচার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সন্মেলনে ৪ শীর্ষ শক্তি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও রাশিয়ার প্রতিনিধিবৃন্দ অংশ গ্রহণ করেন। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র একটি নিয়মিত ও স্বচ্ছ বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে যুদ্ধপরাধে অভিযুক্তদের বিচার এবং তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের আইনগত অধিকারের প্রশ্ন উত্থাপন করে। ৮ আগস্ট তারিখে মিত্রশক্তির ৪ শীর্ষ দেশ ইউরোপিয় অক্ষশক্তির শীর্ষ যুদ্ধপরাধীদের বিচার ও শাস্তি সংক্রান্ত চুক্তি (Agreement for the Prosecution and Punishment of the Major War Criminals of the European Axis Powers) স্বাক্ষর করে। এই চুক্তি লন্ডন চুক্তি নামেও পরিচিত। লন্ডন চুক্তিতে সিদ্ধান্ত হয় যে যুদ্ধপরাধের বিচার অনুষ্ঠিত হবে আন্তর্জাতিক সামরিক আদালতে। লন্ডন চুক্তির সাথে একটি চার্টার সংযুক্ত করা হয় বিচার কার্য পরিচালনার বিধিবিধান নিয়ে। এই চার্টার নূরেনবার্গ চার্টার নামে ইতিহাসে পরিচিত। ইউরোপে যুদ্ধপরাধের বিচার কার্যের জন্যে প্রাথমিকভাবে পছন্দসই স্থান ছিল লাইপজিগ ও লুক্সেমবার্গ। সোভিয়েত রাশিয়ার ইচ্ছে ছিল বিচার হবে বার্লিনে। তবে নূরেনবার্গ শহর বিচারের স্থান হিসেবে অগ্রাধিকার লাভ করে সেখানকার প্যালেস অব জাস্টিস নামক সুপরিসর ভবন এবং সংলগ্ন বড় একটি জেলখানার সুবিধার জন্যে। তবে রাশিয়ার সান্ত্বনার জন্যে যুদ্ধপরাধের বিচারে নূরেনবার্গকে বাছাই করা হলেও ট্রাইবুনালের দপ্তর হিসেবে স্বীকৃত হয় বার্লিন। নূরেনবার্গ চার্টারের ২২ নং অনুচ্ছেদে সেজন্যে বার্লিনকে স্থায়ী দপ্তর হিসেবে উল্লেখ করার পাশাপাশি এটাও বলা হয়েছে যে প্রাথমিক বিচার কার্য অনুষ্ঠিত হবে নূরেনবার্গে।
নূরেনবাগস্থিত প্যালেস অব জাস্টিস
পক্ষান্তরে জাপানের আগ্রাসন রোধের জন্যে জার্মানির পোটসডাম শহরে ১৯৪৫ সালের জুলাই মাসে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন ও সোভিয়েত রাশিয়া এক বৈঠকে মিলিত হয়। ঐ বৈঠকের ফলাফল স্বরূপ জাপানকে যুদ্ধ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়ে যুদ্ধপরাধের জন্যে দায়ী ব্যাক্তিদেরকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করা হবে বলে আগাম হুশিয়ারি উচ্চারণ করে ১৯৪৫ সালের ২৬ জুলাই ত্রিপক্ষীয় চুক্তি সম্পাদিত হয় যা পোটসডাম ঘোষণা (Potsdam Declaration) নামে পরিচিত। এ চুক্তি সম্পাদনের সময় পোটসডামে রাশিয়ার জোসেফ স্টালিন উপস্থিত থাকলেও রাশিয়া জাপানের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত না থাকার সুবাদে চুক্তিস্বাক্ষর করা থেকে বিরত থাকে। রাশিয়া জাপানের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয় ১৯৪৫ সালের ৮ আগস্ট। একই বছর ১৫ আগস্ট জাপান আত্মসমর্পন করলে জাপানি যুদ্ধপরাধীদের বিচারের জন্যে জেনারেল ডগলাস ম্যাক অর্থারের কমান্ডের অধীনস্ত  আমেরিকার দক্ষিণ মহাসাগরস্থিত মিলিটারি ট্রাইবুনালকে দায়িত্ব অর্পন করা হয়। ইউরোপে স্থাপিত যুদ্ধপরাধের বিচারের ট্রাইবুনালের  আন্তর্জাতিক মিলিটারি ট্রাইবুনাল (International Military Tribunal সংক্ষেপে IMT) ১৯৪৫ বা নূরেনবার্গ ট্রায়াল নামে এবং দূরপ্রাচ্যে যুদ্ধপরাধের বিচারের জন্যে স্থাপিত ট্রাইবুনাল দুর প্রাচ্যের জন্য আন্তর্জাতিক মিলিটারি ট্রাইবুনাল (International Military Tribunal for the Far East 1946) ১৯৪৬ বা টোকিও ট্রায়াল নামে সুপরিচিত। যুদ্ধপরাধের অভিযোগে এই দুই আদালত গঠন যুদ্ধপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারি অগ্রগতি।
নূরেনবার্গ আদালতে উপবিষ্ট অভিযুক্তবৃন্দ

লন্ডন চুক্তি ও নুরেনবার্গ চার্টার

 লন্ডন চুক্তি (London Agreement of August 8th 1945) ভূমিকাসহ মোট ৭টি অনুচ্ছেদের সমষ্টি। এই চুক্তি দ্বারা মস্কো ঘোষণাকে সমর্থন করা হয় এবং জার্মান যুদ্ধপরাধীদের বিচারের জন্যে ট্রাইবুনাল গঠনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। লন্ডন চুক্তির ২নং অনুচ্ছেদে বলা হয় যে আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনালের গঠন, এক্রিয়ার এবং কার্যক্রম চুক্তির সঙ্গে সংযুক্ত চার্টারের মোতাবেক নির্ধারিত হবে। সেই সাথে বলা হয় যে চার্টারটি হবে চুক্তির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই চার্টার (Charter of the International Military Tribunal) লন্ডন চুক্তির অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও চুক্তিটি নূরেনবার্গ চার্টার হিসেবে ব্যাপকভাবে পরিচিত। নূরেনবার্গ চার্টারের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ২নং অনুচ্ছেদে যুদ্ধ সংক্রান্ত অপরাধের সংজ্ঞা নির্ধারণ। ২নং অনুচ্ছেদে শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ ( CRIMES AGAINST PEACE), যুদ্ধপরাধ ( WAR CRIMES) ও মানবতাবিরোধী অপরাধ (CRIMES AGAINST HUMANITY) এই ৩ ধরণের অপরাধকে সংজ্ঞায়িত করা হয়। যথা:
 . বিনা উস্কানিতে অথবা অথবা আন্তর্জাতিক চুক্তি বা সমঝোতা ভঙ্গ করে অন্যদেশের উপর আগ্রাসী আক্রমণের পরিকল্পনা, প্রস্তুতি গ্রহণ, যুদ্ধের পদক্ষেপ গ্রহণ,  অথবা এইসব অন্যায় কাজের সাধারণ পরিকল্পনা বা ষড়যন্ত্রে অংশগ্রহণ শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে (অনুচ্ছেদ ৬ এর এ); 
২. যুদ্ধের প্রচলিত প্রথার বরখেলাপ, যথা: অধিকৃত অঞ্চলের বেসামরিক লোকজনকে হত্যা, তাদের প্রতি অমানবিক আচরণ বা তাদেরকে দাসশ্রমিক হিসেবে নিয়োজিত করণ, অথবা অধিকৃত এলাকায় বা সমুদ্রে যুদ্ধবন্দীদেরকে হত্যা, তাদের প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ, জিম্মিব্যাক্তিদের হত্যা, সামরিক দিক থেকে অপ্রয়োজনীয় সরকারি-বেসরকারি সম্পদ. শহর, নগর, গ্রামসমূহের নির্বিচারে ধ্বংস সাধন যুদ্ধপরাধ হিসেবে (অনুচ্ছেদ ৬এর বি);
.  এবং যুদ্ধের আগে বা যুদ্ধচলাকালীন সময় বেসামরিক লোকজনকে হত্যা, দাসত্বে নিয়োজিত করা, স্থানচ্যুত করাসহ অমানবিক আচরণ অথবা রাজনৈতিক, গোত্রগত বা ধর্মবিশ্বাসের কারণে ট্রাইবুনালের আওতাধীন কোন অপরাধ সংগঠন মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে সাব্যস্থ করা হয় (অনুচ্ছেদ ৬এর সি)। 

অপরাধ সংক্রান্ত চার্টারের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ঠগুলো নিম্নে বর্ণনা করা হলো:

ক. অভিযুক্ত ব্যাক্তির পদ যথা: রাষ্ট্রের প্রধান অথবা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত থাকার জন্যে কোন অনুকম্পার সূযোগ থাকবে না। (অনুচ্ছেদ ৭)
খ. অভিযুক্ত উর্ধতন কর্মকর্তার আদেশ পালন করেছেন, অপরাধের বিচার থেকে এ যু্ক্তি থেকে রেহাই পাওয়া যাবেনা, তবে শাস্থি লাঘবেরে ক্ষেত্রে এ বিষয়টি বিবেচনায় আনা যেতে পারে। (অনুচ্ছেদ ৮)
গ. কোন গ্রুপ বা সংগঠনের কোন সদস্যের বিচার কালে অভিযুক্তকে শাস্থি প্রদান করা হলে, ঐ গ্রুপ বা সংগঠনকে অপরাধমূলক সংগঠন হিসেবে ঘোষণা দিতে পারবে। (অনুচ্ছেদ ৯)
ঘ. কোন সংগঠন বা গ্রুপকে অপরাধমূলক হিসেবে ঘোষিত হলে, ঐ সংগঠনের সদস্যরা ‍বিচারের আওতাভুক্ত হবে। (অনুচ্ছেদ ১০)

বিচারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জন্যে চার্টারে অভিযুক্তদের আত্মপক্ষ সমর্থনসহ যেসব অধিকার দেয়া হয়, সেগুলো নিম্নরূপ:
১. কাউকে অভিযুক্ত করা হলে তার বিরুদ্ধে আনীত সকল অভিযোগের বিস্তারিত বিবরণ অভিযোগ নামায় অন্তর্ভূক্ত হবে এবং এর অনুলিপি অভিযুক্তকে সরবরাহ করা হবে এমন ভাষায় যে ভাষা অভিযুক্তের বোধগম্য। (আর্টিকেল ১৬এর এ)
২. প্রাথমিক পরীক্ষানীরিক্ষার সময় একজন বিবাদী তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের ব্যাখ্যা প্রদানের অধিকার ভোগ করবে। (আর্টিকেল ১৬ এর বি)
৩. বিবাদির প্রাথমিক বিচার তদন্ত ও বিচার কালে অভিযুক্তের বোধগম্য ভাষায় বিচার কার্য চলবে অথবা তাকে অনুবাদ করে দেয়া হবে। (অনুচ্ছেদ ১৬ এর সি)
৪. অভিযুক্ত ব্যাক্তি নিজে অথবা একজন আইনজীবির মাধ্যমে নিজের পক্ষ সমর্থন করতে পারবে। ( অনু:১৬এর ডি)
৫. অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজে অথবা তার নিয়োজিত আইনজীবির মাধ্যমে তার স্বপক্ষে সাক্ষ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করতে পারবে এবং বাদী পক্ষের সাক্ষ্যদেরকে জেরা করতে পারবে। (অনুচ্ছেদ ১৬ এর ই)
৬. নুরেনবার্গ চার্টারে অভিযুক্তদের শাস্তির আদেশের বিরুদ্ধে রিভিউ বা আপিলের সরাসরি ব্যবস্থা ছিল না। তবে আর্টিকেল ২৯ মোতাবেক জার্মানির নিয়ন্ত্রণ সংস্থাকে (Control Council for Germany) সাজা বৃদ্ধির অধিকার রহিত করে প্রদত্ত দন্ড লাঘব বা পুনর্বিবেচনা করার অধিকার অর্পন করা হয়।
৭. আর্টিকেল ১৩ মোতাবেক চার্টারের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ না হওয়ার শর্তে যুদ্ধপরাধের বিচারের কার্যবিধিমালা (Rules of Procedure) প্রণয়নের অধিকার দেয়া হয় ট্রাইবুনালকে। কার্যবিধিমালার ৪ নং রুলে নিজের পক্ষে কোন সাক্ষী বা প্রমাণাদি হাজির করার জন্যে আদালতের মাধ্যমে তা বাস্তবায়িত করার অধিকার লাভ করে অভিযুক্ত ব্যাক্তিরা।
নূরেনবার্গ চার্টারের অন্যান্য বৈশিষ্ঠ
নূরেনবার্গ চার্টারের প্রধান বৈশিষ্ঠ হচ্ছে শত্রুপক্ষকে একটি বিচার প্রক্রিয়ায়র মাধ্যমে আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার প্রদান করে যাদের প্রতি অপরাধ করা হয়েছে, তাদের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত আদালতে বিচারের সম্মুখীন করা। লাইপজিগ বিচার পরাজিত জার্মানীর হাতে তুলে দিয়ে যে ভুল করা হয়েছিল, নূরেনবার্গ চার্টারে সে ভুল শোধরানো হয়। নূরেনবার্গ ট্রাইবুনালে জার্মান যুদ্ধপরাধীদের বিচার করে ২য় বিশ্বযুদ্ধে বিজয়ী মিত্রশক্তির বৃটেন, ফ্রান্স, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত রাশিয়ার মনোনীত বিচারপতিগণের সমন্বয়ে গঠিত আদালত।
যে আইনপদ্ধতি অনুসরিত হয় নূরেনবার্গ ট্রায়ালে তা ছিল ইউরোপে প্রচলিত সিভিল ও কমন ল' এই দুই ধরণের বিচার পদ্ধতির সমন্বয়। তবে ইউরোপের মূল ভূখন্ডে প্রচলিত সিভিল বিচার পদ্ধতি প্রাধান্য লাভ করে। কমন ল'-এর জুরির বিচারের পরিবর্তে নূরেনবার্গে ট্রায়াল হয় বিচারপতিদের একটি প্যানেলের মাধ্যমে। এছাড়া প্রচলিত সাক্ষ্য আইনের নীতিমালার সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ হিয়ারসে বা শোনা কথা (hearsay) সাক্ষ্য হিসেবে গৃহীত হয়।

 বিচার কার্যক্রম

 নূরেনবার্গস্থিত আন্তর্জাতিক মিলিটারি ট্রাইবুনালের মূল বিচারক ছিলেন বৃটেনের কর্নেল স্যার জিওফ্রে লরেন্স (Geoffrey Lawrence), আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ফ্রান্সিস বিড্ডল (Francis Biddle), সোভিয়েত রাশিয়ার মেজর জেনারেল আয়োনা নিকিচেঙ্কো (Iona Nikitchenko) এবং ফ্রান্সের প্রফেসর হেনরি দনেদি দ্য ভ্যাবরেস ( Henri Donnedieu de Vabres)।
কর্নেল স্যার জিওফ্রে লরেন্স (মাঝখানে)
তাদের বিকল্প বিচারক ছিলেন যথাক্রমে স্যার নরমান বিরকেট (Norman Birkett), জন জে পারকার, লে.কর্ণেল আলেক্সান্ডার ভলচকভ (Alexander Volchkov) এবং রবার্ট ফ্যালকো। বাদীপক্ষে চীফ প্রসিকিউটর ছিলেন যুক্তরাজ্যের এটর্নী জেনারেল স্যার হার্টলি শওক্রস (Hartley Shawcross), আমেরিকার সুপ্রীম কোর্টের বিচারক রবার্ট এইচ জ্যাকসন, সোভিয়েত লে. জেনারেল রোমান আন্দ্রেয়েভিচ রুডেঙ্কো এবং ফ্রান্সের ফ্রান্সিসকো দ্য মেনথন ( পরবর্তীতে আগস্টে শ্যাম্পেটিয়ার দ্য রিবস Auguste Champetier de Ribes তার স্থলাভিষিক্ত হন)। পক্ষান্তরে বিবাদী পক্ষের এটর্নিবৃন্দ ছিলেন প্রধানত: জার্মান আইনজীবি। বিবাদী পক্ষে যেসব আইনজীবি ছিলেন তারা হলেন, জর্জ ফ্রসমান (Georg Fröschmann) , হাইনস ফ্রিটস (Heinz Fritz), ওটো প্যানেন বেকার (Otto Pannenbecker) আলফ্রেড থমা (Aled Thoma), কুর্ট কাউফমান (Kurt Kauffmann) হ্যানস লেটারনসের (Hans Laternser), ফ্রান্জ এক্সনার (Franz Exner) আলফ্রেড সেইডাল (Alfred Seidl), ওটো স্টেহমের (Otto Stahmer), ওয়ালটার বালাস (Walter Ballas), হান ফ্লেচার (Hans Flächsner), গুন্টার ফন ররসাইডট (Günther von Rohrscheidt), ইগন কুবুশ্চক (Egon Kubuschok), রবার্ট সারভেটিয়াস (Robert Servatius), ফ্রিটজ সাওটার (Fritz Sauter), বালথার ফুন্ক (Walther Funk), হানস মার্ক্স (Hanns Marx), ওটো নেলটে (Otto Nelte) এবং হার্বাট ক্রা্উস (Herbert Kraus)।
ইন্টারন্যাশনাল মিলিটারি ট্রাইবুনাল নূরেনবার্গে বিচার কাজ শুরু করে ১৯৪৫ সালের ২০ অক্টোবর। ২৪ জন শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী এবং ৭টি প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে বাদীপক্ষ। সংগঠনগুলোর মধ্যে ছিল: নাজি পার্টি, রাইখ কেবিনেট, প্রটেকশন স্কোয়াড্রন বা এস এস (Schutzstaffel), সিকিউরিটি সার্ভিস বা এস ডি (Sicherheitsdienst), গেস্টাপো, ব্রাউন শার্ট নামে পরিচিত প্যারামিলিটারি বা এস এ (Sturmabteilung) এবং জেনারেল স্টাফ ও হাই কমান্ড নামে কয়েক ধরণের উচ্চ পদস্থ মিলিটারি কর্মকর্তা। এই ৭টি সংগঠনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমানিত হলে তাদেরকে 'অপরাধমূলক' সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করাই ছিল অভিযুক্ত করার উদ্দেশ্য।
নাৎসীদের প্রতীক স্বস্তিকা
এমনিতে জার্মানদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনয়ন করা হয়, সেগুলো ছিল:
১. মানবতাবিরোধী অপরাধ সংগঠনের জন্যে সাধারণ পরিকল্পনা বা ষড়যন্ত্র করা।
২. উস্কানি ব্যতিরেকে যুদ্ধ বাধানোর পরিকল্পনা, উদ্যোগ গ্রহণসহ শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ সংগঠন।
৩. যুদ্ধপরাধ।
৪. মানবতাবিরোধী অপরাধ।
ড্যাপ, প্যাপ ও গ্যাস্টোপোর প্রতীক

২৪ জন জার্মান অভিযুক্তদের মধ্যে ছিলেন নাজি নেতা, কূটনীতিক, অর্থনীতিবিদ, রাজনীতিবিদ এবং সামরিক শীর্ষনেতৃবৃন্দ। ২৪ জন অভিযুক্তের মধ্যে এডলফ হিটলার, হেনরিক হিমলার এবং জোসেফ গোয়েবলস আত্মসমর্পনের পূর্বে আত্মহত্যা করায় তাদের বাদ দেয়া হয় বিচার প্রক্রিয়া থেকে, যাতে সাধারণ মানুষের মনে এ ধারণা না জন্মায় যে তারা জীবিত আছেন। ট্রাইবুনাল ২৪ জনের মধ্যে এই ৩ জনকে মরণোত্তর বিচার থেকে বাদ দিয়ে মূলত ২১ জনকে বিচারের কাঠগড়ায় তুলে। ২১ জনের মধ্যে নাজি পার্টির সেক্রেটারি মার্টিন বোরম্যান পলাতক থাকায় তার অনুপস্থিতেই বিচার কার্য শুরু হয়। এদিকে বিচারের প্রাক্কালে অন্যতম অভিযুক্ত রবার্ট লেভ  আত্মহত্যা করলে বাস্তবত ট্রাইবুনালে হাজির করা হয় ২০ জন আসামী। এই ২০ জনের মধ্যে বর্ষীয়ান জার্মান শিল্পপতি গুস্তাভ ক্রাপকে প্রাথমিক শুনানীকালে বিচার থেকে বাদ দেয়া হয়। নূরেনবার্গ ট্রায়ালে বাদী পক্ষে সাক্ষ্যদান করেন ৩৩ জন, পক্ষান্তরে বিবাদী পক্ষে সাক্ষ্যদেন ৮০ জন; লিখিত সাক্ষ্য প্রদান করেন আরো ১৪০ জন। বাদীপক্ষ মামলার প্রমাণ হিসেবে দাখিল করে সামরিক, কূটনৈতিক এবং নাজি শাসনাধীন সরকারি দলিলপত্র। বিচার মিলিটারি ট্রাইবুনালে অনুষ্ঠিত হলেও, বিচার কার্য পরিচালিত হয় উন্মুক্ত অধিবেশনে। বিচার কার্য প্রত্যক্ষ করতে ২৩টি দেশের ৩২৫ জন সংবাদদাতাসহ প্রায় ৪০০ দর্শনার্থীর সমাগম হতো প্রতিটি অধিবেশন।
নূরেনবার্গ ট্রায়ালের ১ম অধিবেশন শুরু হয় ১৯৪৫ সালের ২০ নভেম্বর সকাল ১০টায়। অন্যতম বিচারক স্যার জিওফ্রে লরেন্স 'এখন যে বিচারকার্য শুরু হচ্ছে তা আইনের ইতিহাসে এক অনন্য সংযোজন' ("This trial, which is now to begin, is unique in the annals of jurisprudence.) উল্লেখ করে বিচার কার্য শুরু করেন। ঐ সময় আসামীর ডকে উপস্থিত ছিলেন ২০ জন অভিযুক্ত। অভিযোগ পাঠ করার মাধ্যমে বিচারকার্য শুরু হয়। অভিযোগের মধ্যে ছিল ৪টি বিষয়: ১নং অভিযোগ- উস্কানিব্যাতিত যুদ্ধ বাঁধানোর পরিকল্পনা, ২নং অভিযোগ- শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ (বিনাউস্কানিতে যুদ্ধ বাঁধানো), ৩নং অভিযোগ-যুদ্ধপরাধ (যেমন: যুদ্ধবন্দীদের হত্যা বা তাদের প্রতি অন্যায় আচরণ, যুদ্ধে বেআইনি অস্ত্র ব্যবহার ইত্যাদি), ৪নং অভিযোগ- মানবতাবিরোধী অপরাধ (ইহুদি, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্দি, দখলকৃত অঞ্চলের বেসামরিক জনগণ ও অন্যান্যের প্রতি কৃত নৃশংসতা ইত্যাদি)। বিচারাধীন ২১ জনের মধ্যে কয়েকজনের বিরুদ্ধে ৪টি অভিযোগের সবকটি থাকলেও সবার বিরুদ্ধে অন্তত ২টি করে অভিযোগ আনয়ন করা হয়। পরদিন আমেরিকার সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি বাদীপক্ষের চিফ প্রসিকিউটর রবার্ট জ্যাকসন সূচনা বক্তব্যের মাধ্যমে বাদী পক্ষের মামলা উপস্থাপন শুরু করেন। বাদীপক্ষের মামলা বা অভিযোগ ছিল প্রধানত দু ধরণের: ১. নাজি শাসনাধীনে কৃত অপরাধমূলক কার্যক্রম, ২. অভিযুক্তদের ব্যাক্তিগত অপরাধমূলক কার্যক্রম। প্রথম ধরণের অভিযোগ প্রমাণের জন্যে বাদী পক্ষ অষ্ট্রিয়াসহ চেকোশ্লাভিয়া, পোলান্ড, ডেনমার্ক, নরওয়ে, বেলজিয়াম, হল্যান্ড, লুক্সেমবার্গ, গ্রীস, যুগোশ্লাভিয়া এবং সোভিয়েত ইউনিয়নে আগ্রাসী আক্রমণের বিষয় উত্থাপন করেন। এসব অভিযোগ প্রমাণের জন্যে বাদীপক্ষ নির্ভর করে প্রধানত দালিলিক প্রমাণের উপর। দ্বিতীয় ধরণের অভিযোগ প্রমাণের সময় অভিযুক্তদের ব্যাক্তিগত অপরাধসমূহ উপস্থাপন করা হয়। এসব অভিযোগ প্রমাণের জন্যে দালিলিক প্রমাণের পাশাপাশি ব্যাক্তিগত সাক্ষ্যসাবুদ হাজির করা হয়। ডিসেম্বরের ১৮ তারিখে নাজি পার্টির নেতৃত্ব, রাইক কেবিনেট, এসএস, গেস্টাপো, এসডি, এসএ এবং জার্মান হাই কমান্ডের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণাদি উপস্থাপন শুরু হয়। ব্যাক্তিগত ও দলগত অপরাধের বর্ণনার সময় আদালতে সাক্ষ্য-প্রমাণের বর্ণনা শুনে অনেকেই শিহরিত হয়ে উঠে, মুর্চ্ছা যায় এবং আদালতে কান্নার রোল পড়ে। ১৯৪৬ সালের ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রসিকিউটর একটি ডকুমেন্টারি ফিল্ম জার্মান ফ্যাসিস্টদের অত্যাচার নীপিড়নের প্রমাণ হিসেবে দাখিল করেন আদালতে। এভাবে ৫ মার্চ পর্যন্ত আদালতে জার্মান অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে এক নাগাড়ে সাক্ষ্য-সাবুদ হাজির করার পর ৬ মার্চ আদালত মূলতবি থাকে।
বিবাদী পক্ষে প্রধান সাক্ষী হিসেবে ডকে উঠেন হেরমান গোয়েরিং (Hermann Goering)। ১৯৩৫ সালে তিনি ছিলেন জার্মান বিমান বাহিনীর প্রধান। দু বছর পর তিনি ৪ বছর মেয়াদি জার্মানির বিতর্কিত উন্নয়ন কর্মসূচীর কমিশনারের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৩৯ সালে ফিনল্যান্ড আক্রমনের পর তাঁকে জার্মানির সর্বোচ্চ সামরিক পদ রাইখ মার্শালে উন্নীত করা হয় এবং সেই সাথে তাঁকে করা হয় হিটলারের উত্তরাধিকারী। বাদীপক্ষ থেকে তাঁকে অভিযুক্ত করা হয় ৪টির সকল অভিযোগে। পোলান্ডে, অষ্ট্রিয়ায় আক্রমণ পরিচালনার পরিকল্পনা ও আক্রমণ চালানো, আত্মসমর্পন করা সত্বেও নেদারল্যান্ডের রটারডাম শহর ধ্বংস করার জন্যে লুফ্টওয়াফ (Luftwaffe) বা বিমান বাহিনীকে আদেশ প্রদানসহ পোলান্ডের বুদ্ধিজীবি, অভিজাত ব্যাক্তিবর্গ এবং যাজকসহ বৃটিশ যুদ্ধবন্দীদের হত্যা, বলপূর্বক শ্রমদাসে নিযুক্তি, ফ্রান্সের যাদুঘর থেকে মূল্যবান শিল্প সামগ্রী চুরি ইত্যাদি অভিযোগ আনয়ন করা হয়েছিল।  তাঁর জবানবন্দী গ্রহণ করেন নিযুক্ত কৌশলী অটো স্টাহমার (Otto Stahmer)। গোয়েরিং জবানবন্দীতে বলেন যে নাৎসি পার্টি আইনগতভাবে ক্ষমতায় আসে এবং ক্ষমতায় আসার পর ঐ ক্ষমতা রাখার জন্যে তারা দৃঢ় সংকল্প ছিলেন। গোয়েরিং তার বিরুদ্ধে আনীত ৪টি অভিযোগ অস্বীকার করেন, এছাড়া তিনি আইন শৃংখলা রক্ষার জন্যে কনসেনট্রেসন ক্যাম্পের স্বপক্ষে বক্তব্য তুলে ধরেন। তিনি জবানবন্দীতে জার্মানির নেতা নির্বাচনে ক্যাথলিক চার্চ ও রাশিয়ার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতিমালার ভিত্তিতে ফুয়েরারের নিকট একচ্ছত্র ক্ষমতা অর্পনের স্বপক্ষে যৌক্তিকতা প্রদর্শন করেন। তবে রবার্ট জ্যাকসন ১৮ মার্চ থেকে একটানা জেরা শুরু করলে, শেষদিকে গোয়েরিং তার অপরাধ স্বীকার করতে বাধ্য হন। ৪ দিন ধরে জেরা করা হয় তাঁকে। তিনি এক পর্যায়ে স্বীকার করেন যে তার প্রণীত আইনের কারণে ইউরোপব্যাপী ইহুদিরা নির্যাতনের শিকার হয়েছে। বিচারে তাঁকে মৃত্যুদন্ড প্রদান করা হয়। তবে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার আগের তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। তিনি মিত্র শক্তি কর্তৃক জার্মানির শীর্ষ পর্যায়ের লোকদের বিচারকে বিজয়ী শক্তির রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক বিচার বলে অভিহিত করেন। তাঁর উক্তি ছিল, "This is a political trial by the victors and it will be a good thing when Germany realizes that..."
 আলফ্রেড রজেনবার্গ (Alfred Rosenberg) ছিলেন পূর্ব ইউরোপীয় অঞ্চলের মন্ত্রী। তাঁর বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ ছিল যে তার আদেশে ইহুদিদের পৃথক করে আবদ্ধ করা হতো ঘেটোতে (ghettos), যেখানে তার নিম্নপদস্থরা আটক ব্যাক্তিদের হত্যা করে মেরে ফেলতো। মামলায় তার স্বাক্ষর করা দলিল দিয়ে প্রমাণ করা হয় যে, অন্যূন ৪০ হাজার যুবককে তিনি জার্মান শ্রম শিবিরে প্রেরণ করেন। এ ছাড়াও ইহুদিদের সম্পদ লুন্ঠনের অভিযোগ উত্থাপিত হয় তার বিরুদ্ধে। রোজেনবার্গ দাবি করেন যে মিত্র শক্তির বোমাবর্ষণে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার জন্যে তিনি ইহুদিদের সম্পত্তি সরকারি হেফাজতে রাখার ব্যবস্থা করেন। বিচারে ৪ টি অপরাধের সবগুলি প্রমাণ হওয়ায় তাকে মৃত্যু দন্ডে দন্ডিত করা হয়।
আলফ্রেড রজেনবার্গ
  পোলান্ডের আউসচিউটসজ (Auschwitz)ক্যাম্পে জড়ো করা মৃতদেহ।
জোয়াসিম রিবেনট্রপ (Joachim von Ribbentrop) ছিলেন জার্মানির পররাষ্ট্র মন্ত্রী, তাকে অভিযুক্ত করা হয় ৪টির সবকটি অভিযোগে। জেরার সময় তাকে জিজ্ঞেস করা হয় যে তিনি জার্মান কর্তৃক পোলান্ড, ডেনমার্ক, নরওয়ে, গ্রিস, ফ্রান্স এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণকে আগ্রাসন ("acts of aggression.") হিসেবে মনে করেন কি না। তিনি উত্তরের তা অবলীলায় অস্বীকার করেন। তিনি বলেন বলেন যে ঐ সব আক্রমণ আগ্রাসন ছিল না, ছিল যুদ্ধসংক্রান্ত বিষয় ( acts of war)। জোয়াসিমের বিরুদ্ধে হাঙ্গেরির ইহুদিদের নিশ্চিহ্ন করার জন্যে উস্কানির অভিযোগ ছিল। বিচারে তাকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়।
গেস্টাপো, এসডি নিয়ন্ত্রনকারি রাইখের কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা কার্যালয়ের প্রধান ড. আর্নস্ট কালটেন ব্রুনার (Dr. Ernst Kaltenbrunner) বিরুদ্ধে ছিল কনসেনট্রেসন ক্যাম্পে মানুষ পোড়ানো, মিত্র বাহিনীর যুদ্ধ বন্দীদের বেআইনিভাবে হত্যা, শ্রমদাসদের মধ্যে যারা দুর্বল তাদের হত্যার নির্দেশ দান সহ অনেকগুলো অভিযোগ। তাকে ৩ ও ৪র্থ নং অপরাধের জন্যে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়।
ড. আর্নস্ট কালটেন ব্রুনার
জার্মানির অধিকৃত পোলান্ডের গভর্ণর জেনারেল হানস ফ্রাংক (Hans Frank)-এর বিরুদ্ধে পোলান্ডে জাতিগত নিপীড়ন ও ইহুদী নির্যাতনের জন্যে আনীত ৩ ও ৪ নং প্রমাণ হওয়ায়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী উইলিয়াম ফ্রিক (Wilhelm Frick)-এর বিরুদ্ধে হহুদি নির্যাতনসহ বোহেমিয়া ও মরাভিয়ায় নিপীড়ন চালানোসহ বিভিন্ন অভিযোগে আনীত ১, ২ এবং ৩ নং অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় তাদেরকে বিচারে মৃত্যুদন্ড প্রদান করা হয়।  সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কমান্ডের ফিল্ড মার্শাল উইলিয়াম কাইটেল (Wilhelm Keitel) জেরায় স্বীকার করেন যে তিনি অসংখ্য আদেশ প্রদান করেন, যা যুদ্ধ আইনের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না। তিনি আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলেন যে তিনি যা করেছেন, তা তাঁর উপরওয়ালার আদেশ মানতে গিয়ে করেছেন। তাঁকে ৪টি অভিযোগের সবকটিতে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। সেই সাথে সামরিক বাহিনীর চীফ অব অপারেশন স্টাফ আলফ্রেড জদি (Alfred Jodl)-কেও তার বিরুদ্ধে আনীত ৪টি অপরাধের সবকটি প্রমানিত হওয়ায়, মৃত্যুদন্ড প্রদান করা হয়।
আলফ্রেড জদি
জুলিয়াস স্টেচার (Julius Streicher) ছিলেন একজন লেখক, সম্পাদক ও প্রকাশক। রেসিস্ট বক্তব্য প্রচারের মাধ্যমে তিনি জার্মান জনগণের মনে সৃষ্টি করেন ইহুদিদের প্রতি তীব্র ঘৃণা, যা গণহ্ত্যা সংগঠনে উদ্বুদ্ধ করে জার্মানদের। তিনি জার্মান সরকারের কোন উচ্চপদে আসীন ছিলেন না, তবু তাঁকে ৪ নং অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদন্ড প্রদান করা হয় রেসিস্ট প্রপাগান্ডার কারণে। ড. আর্থার সেইস ইনকার্ট (Dr. Arthur Seyss-Inquart) ছিলেন অস্ট্রিয়ার নাগরিক এবং হিটলার কর্তৃক নিযুক্ত অস্ট্রিয়া ও নেদারল্যান্ডের গভর্ণর। তাঁকে প্রায় আড়াই লাখ ইহুদিকে জার্মানে প্রেরণসহ অস্ট্রিয়া, পোলান্ড ও চেকোশ্লাভিয়া দখলে হিটলারকে সহায়তার জন্যে ২, ৩ ও ৪নং অপরাধে দোষী সাব্যস্থ করে মৃত্যুদন্ড প্রদান করা হয়।
জুলিয়াস স্টেচার
জেনারেল ফ্রিটজ সাউকেল (Fritz Sauckel)-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল যে তিনি প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ ইউরোপীয়কে বলপূর্বক পরিকল্পিতভাবে শ্রমদাস হিসেবে নিযুক্ত করেন। বিচারে তাকে ৩ এবং ৪ নং অপরাধে মৃতুদন্ড প্রদান করা হয়।
রুডলফ হেস (Rudolph Hess) ছিলেন হিটলারের ডেপুটি এবং নাৎসী দলের নেতা। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয় যে ইহুদিদের হয়রানী করার জন্যে তিনি ডিক্রি জারি করেন এবং অস্ট্রিয়া, চেকোশ্লাভাকিয়া এবং পোলান্ড আক্রমনে স্বেচ্ছায় জড়িত ছিলেন। বিচারের সময় তার স্বাক্ষর করা দলিলাদি আদালতে প্রদর্শন করা হয়, তবে তিনি আগের সব কিছু ভুলে গেছেন মর্মে আত্মপক্ষ সমর্থন করলেও পরে তা প্রত্যাহার করেন। ১ ও ২ নং অভিযোগ প্রমাণ
জেনারেল ফ্রিটজ সাউকেল
হওয়ায় যাবজ্জীবন কারাদন্ড প্রদান করা হয় হেসকে। একই ভাবে জার্মান মন্ত্রী আলবার্ট স্পিয়ার-এর বিরুদ্ধে ৩ ও ৪ নং অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে দন্ড দেয়া হয় ২০ বছরের জেল। তিনি ছিলেন যুদ্ধের সময় জার্মানদের অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহকারি। চোকেশ্লাভিয়ার ব্যারণ কনস্টানটিন ফন নিউরথ (Baron Konstantin von Neurath)কে ৪টি অপরাধে সাব্যস্থ করলেও তাকে দেয়া হয় ১৫ বছরের কারাদন্ড। তার বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ ছিল যে তিনি ভার্সাই চুক্তির ঘোর বিরোধীতা করতেন এবং লীগ অব নেশনস থেকে জার্মানীর বেড়িয়ে আসার জন্যে উস্কানি প্রদান করতেন। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে গতানুগতিক নৃশংসতার অভিযোগ আনা হয়েছিল। ভিয়েনার গভর্নর বালডুর ফন শিরাক (Baldur von Schirach)-এর বিরুদ্ধে জার্মান যুব সমাজকে যুদ্ধবাজ হিসেবে উৎসাহিত করার এবং ভিয়েনার ইহুদিদের পোলান্ডে নির্বাসিত করার অভিযোগ আনয়ন করা হয়। ৪ নং অপরাধ প্রমানিত হওয়ায় তাকে দেয়া হয় ২০ বছরের কারাদন্ড। এরিখ রেইডার (Erich Raeder) ছিলেন জার্মান নৌবাহিনীর প্রধান। হিটলারের সাথে মতদ্বৈদতার কারণে তিনি ইস্তাফা দেন ১৯৪৩ সালে। তার স্থলাভিষিক্ত হন কার্ল ডইনিটজ (Karl Doenitz)। বিচারে উভয়কে সমুদ্রে অন্যায় ভাবে হুশিয়ারি ব্যতীত জার্মান সাবমেরিণ দ্বারা মিত্র পক্ষের বানিজ্যিক জাহাজ ধ্বংস করার জন্যে অভিযুক্ত করা হয়। বিচারে ১, ২ ও ৩ নং অপরাধে রেইডারকে যাবজ্জীবন ও ডইনিটজকে ১০ বছরের কারাদন্ড প্রদান করা হয়। নাৎসি অর্থ মন্ত্রী ওয়ালথার ফুংক (Walther Funk)কে আক্রমণাত্মক যুদ্ধে অর্থ সরবরাহ এবং জার্মানির শিল্প কারখানায় বিদেশি শ্রমিকদের বলপূর্বক নিয়োগের জন্যে দোষী সাব্যস্ত করে দেয়া হয় যাবজ্জীবন কারাদন্ড। এছাড়া সংগঠন হিসেবে নাৎসী সংগঠন এসএস, এসডি, গেস্টাপো এবং নাৎসি দল ঘোষিত হয় অপরাধ মূলক সংগঠন হিসেবে। মামলায় ২ জন খালাস পান, তারা হলেন: গোয়েবলসের প্রপাগান্ডায় নিয়োজিত ১২টি সংস্থার অন্যতম রেডিও বিভাগের প্রধান হ্যান ফ্রিটসে (Fritzsche, Hans), তুরস্কে নিযুক্ত জার্মান রাষ্ট্রদূত ফ্র্যানজ ফন পাপান (Papen, Franz von) এবং যুদ্ধপূর্ব সময়ে রাইখ ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ও অর্থমন্ত্রী জামলার শাখট (Schacht, Hjalmar)।
নূরেনবার্গ ট্রায়ালে বিচারকগণ রায় ঘোষণা করেন ১৯৪৬ সালের ১ অক্টোবর। বিচারে মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত আসামীদের ফাঁসি ১৬ অক্টোবর কার্যকর করার পর তাদের মৃতদেহ ডাচাও (Dachau) নামক স্থানে পোড়ানোর পর দেহভস্ম ফেলে দেয়া হয় ইসার (Isar) নদীতে।
 Gen. Anton Dostler মৃতূদন্ড কার্যকরের দৃশ্য 
২য় বিশ্বযুদ্ধের পর নূরেনবার্গে আন্তর্জাতিক সামরিক আদালতে অনুষ্ঠিত এই বিচার হচ্ছে যুদ্ধপরাধের অনেকগুলো বিচারের মধ্যে সর্ব প্রথম। আন্তর্জাতিক সামরিক আদালতে অনুষ্ঠিত বিচার ব্যতীত অন্যান্য যুদ্ধপরাধীর বিচারের জন্যে জার্মান কন্ট্রোল কাউন্সিল কর্তৃক ১৯৪৫ সালের ২০ ডিসেম্বর তারিখে জারিকৃত ১০ নং আইন জারি করা হয়েছিল। এই আইনের অধীনে ব্যাপক সংখ্যক যুদ্ধপরাধীর বিচার হয়েছে, যাদের মধ্যে ছিল কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের প্রধান ও প্রহরীবৃন্দ, পুলিশ কর্মকর্তা, মোবাইল হত্যাযজ্ঞের ইউনিটের (Einsatzgruppen) সদস্যবৃন্দ, বন্দীদের উপর পরীক্ষা চালানোর জন্যে দায়ী ডাক্তার, গেস্টাপো, এসএস বাহিনীর সদস্য, শিল্পপতিসহ অনেকে। এসমস্ত যুদ্ধপরাধীদের বিচার হয়েছে বৃটিশ, আমেরিকা, ফ্রান্স এবং সোভিয়েত রাশিয়া কর্তৃক জার্মান ও অষ্ট্রিয়ার অভ্যন্তরভাগে নিজ নিজ দখলকৃত এলাকায় নিজস্ব সামরিক আদালতে। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র একাই তাদের নিজস্ব সামরিক আদালতে ১২টি মামলায় ১৮৩ জনকে অভিযুক্ত করে তাদের অধিকৃত নূরেনবার্গ শহরে বিচার অনুষ্ঠিত করে (পাশাপাশি আমেরিকার দখলকৃত Dachau শহরেও একই কায়দায় যুদ্ধপরাধের অভিযোগে বিচার কার্য অনুষ্ঠিত হয়)। এই বিচারকার্যসমূহ নূরেনবার্গ পরবর্তী বিচার বা Subsequent Nuremberg Proceedings, এমনকী নূরেনবার্গ ট্রায়ালস হিসেবে অধিক পরিচিত। আমেরিকানদের এই বিচারে ১২ জনকে মৃত্যুদন্ড, ৮ জনকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড এবং ৭৭ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে দন্ডিত করা হয়। অন্যান্যরা খালাস পায়। নূরেনবার্গ পরবর্তী ১২টি বিচারের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত ছিল মেডিকেল মামলা (The Medical Case), মিলস মামলা (The Milch Case), জাস্টিস মামলা (Justice Case), প্পল মামলা (Pohl Case), ফ্লিক মামলা ( Flick Case), আই.জি. ফারবেন মামলা (I.G. Farben Case), হোস্টেজ মামলা (Hostage Case), রুশা মামলা (RuSHA Case), আইনস্টাজগ্রুপেন মামলা (Einsatzgruppen Case), ক্রপ মামলা (Krupp Case), মিনিস্ট্রিস মামলা (Ministries Case) এবং হাই কমান্ড মামলা (High Command Case)।
 বৃটিশ অধিকৃত এলাকায় অবস্থিত লুয়েনবুর্গ (Lueneburg), হামবুর্গ এবং ভুপ্পারটেল (Wuppertal) শহরে নিজেদের গঠনকৃত সামরিক আদালতে ১০৮৫ অভিযুক্তের বিচার করে ২৪০ জনকে মৃত্যুদন্ড প্র্রদান করে। ফ্রান্সের এলাকায় বিচার হয় ২১০৭ জন অভিযুক্তের। তাদের মধ্যে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয় ১০৪ জনকে। রাশিয়া ব্যতীত যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন ও ফ্রান্স ১৯৪৫ সাল থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত মোট ৫০২৫ জনকে অভিযুক্ত করে বিচারের সম্মুখীন করে এবং আদালতে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয় মোট ৮০৬ জনকে। মৃতুদন্ড প্রাপ্ত মোট আসামীদের মধ্যে ৪০৮৬ জনের দন্ড কার্যকর হয়, বাকীরা ক্ষমার আওতায় বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড লাভ করে। তবে সোভিয়েত ইউনিয়নের দখলকৃত এলাকায় তাদের গঠিত সামরিক আদালতে কতজনকে বিচারের আওতায় আনা হয়েছে বা কতজনকে দন্ড দান করা হয়েছে, তার সরকারি কোন হিসেব পাওয়া যায় না। অনুমান করা হয় যে, প্রায় লক্ষাধিক জার্মান সেখানে অভিযুক্ত হয়েছে এবং প্রায় সবাইকে কোন না কোন দন্ডে দন্ডিত করা হয়েছে।
অপরদিকে জাতিসংঘের যুদ্ধপরাধ কমিশন যুদ্ধপরাধীদের ৮০টি তালিকা তৈরি করে। ঐ তালিকায় জাপানি যুদ্ধপরাধীসহ মোট ৩৬ হাজার ৫২৯ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। এ তালিকা অনুযায়ী আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, গ্রীস, নেদারল্যান্ড, নরওয়ে, পোলান্ড ও যুগোশ্লাভিয়ায় আরো ৯৬৯টি ট্রায়ালের মাধ্যমে ৩ হাজার ৪৭০ জন জার্মানকে যুদ্ধপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। বিচারে তাদের মধ্যে ৯৫২ জনকে দেয়া হয় মৃত্যূদন্ড, ১ হাজার ৯০৫ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড এবং খালাস দেয়া হয় ৬১৩ জনকে। পশ্চিম জার্মানেও যুদ্ধপরাধের অভিযোগে জার্মানদের বিচার অনুষ্ঠিত হয়, তবে সেখানে কোন গুরুদন্ড প্রদান করা হয়নি।

  আন্তর্জাতিক আইনের ক্ষেত্রে নূরেনবার্গ ট্রায়ালস-এর অবদান ও প্রভাব

এটা অস্বীকার করার উপায় নাই যে নূরেনবার্গ ট্রায়ালের বিরুদ্ধে প্রবল সমালোচনা সত্বেও, এ কথা সবাই স্বীকার করেন যে যুদ্ধপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে এই ট্রায়াল বিশ্বের আন্তর্জাতিক আইনের ক্ষেত্রে যুগান্তকারী সংযোজন।
প্রথমত: নূরেনবার্গ ট্রায়াল স্থাপিত করেছে যে, যতই উচ্চপদে নিয়োজিত থাকুক না কেন, যুদ্ধ চলাকালীন ব্যা্ক্তিগত আচরণের জন্যে যে কাউকে ব্যাক্তিগতভাবে দায়ী করা যায়; এ বিষয়ে দেশ, সরকার বা সামরিক বিভাগকে দোষ দিয়ে যুদ্ধপরাধের অভিযোগ থেকে রেহাই পাওয়া যাবে না।
দ্বিতীয়ত: যুদ্ধপরাধের ক্ষেত্রে কোন ব্যাক্তি উর্ধতন কর্তৃপক্ষের আদেশের দোহাই দিয়ে নিজের কৃতকর্ম স্থালন করতে পারবে না, বরং আন্তর্জাতিক আইন মান্য করা না করার বিষয়টি হবে বিবেচনার প্রধান বিষয়।
তৃতীয়ত: শান্তি বিঘ্নিত করা জনিত অপরাধ (crimes against peace), মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং যুদ্ধপরাধের ধারণাকে সংজ্ঞায়িত করা এবং বিচারের মাধ্যমে ঐ সংজ্ঞাসমূহকে প্রতিষ্ঠিত করা।
নুরেনবার্গ বিচারই বিশ্ব ইতিহাসে যুদ্ধপরাধের জন্যে গঠিত প্রথম বহুজাতিক ট্রাইবুনাল। কোন রাষ্ট্রের শীর্ষ ব্যাক্তিদের বিচারের আওতায় এনে আন্তর্জাতিক সামরিক ট্রাইবুনালের মাধ্যমে তাদেরকে সর্বোচ্চ শাস্থি প্রদান করার নজীরও নূরেনবার্গ বিচারের অবদান। এছাড়া যুদ্ধপরাধের এই বিচার হয় উন্মুক্ত আদালতে, যেখানে গণমাধ্যমের প্রবেশাধিকার ও বিচারের কার্যাবলী প্রকাশের কোন বাধা আরোপ করা হয়নি। নূরেনবার্গ ট্রায়ালসমূহ শুধু যে ২য় বিশ্বযুদ্ধে সংগঠিত যুদ্ধপরাধের বিচারের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে তা নয়, বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী আন্তর্জাতিক যুদ্ধ আইনের (International humanitarian law) অগ্রগতির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছে। ১৯৪৮ সালের গণহত্যা কনভেনশন, ১৯৪৯ সালের জেনেভা কনভেনশন, ১৯৭৭ সালের জেনেভা প্রটোকল, যূগোশ্লাভিয়া ও রুয়ান্ডার জন্যে গঠিত আন্তর্জাতিক ফৌজদারি ট্রাইবুনালের স্ট্যাটুস, আন্তর্জাতিক ফৌজাদারি আদালতের রোম স্ট্যাটুস তারই উদাহরণ।

নূরেনবার্গ ট্রায়ালসের সমালোচনা:  

নূরেনবার্গ ট্রাইবুনালের বিচার নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে প্রবল সমালোচনা রয়েছে। নানা কারণে নূরেনবার্গ বিচার অত্যন্ত বিতর্কিত।
১. প্রথমত নূরেনবার্গ সামরিক আদালত গঠনের আগে যুদ্ধপরাধের বিচারের জন্যে সম্মত কোন আইন ছিল না। নূরেনবার্গ ট্রায়ালের আইনগত মূল ভিত্তি ছিল ১৮৯৯ ও ১৯০৭ সালের হেগ কনভেনশন, যার মধ্যে যুদ্ধপরাধের বিচারের বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এছাড়াও ছিল ১৯৪৩ সালের মস্কো ডিক্লারেশন ও ১৯৪৫ সালের পোস্টডাম ডিক্লারেশন। কিন্তু ১৮৯৯ সালের হেগ কনেভেনশন ব্যতীত অন্যসব আইনে জার্মানী বা জাপানের পূর্বসম্মতি না থাকায় তাদের উপর ঐ আইনের প্রয়োগের ভিত্তি ছিল না বা আন্তর্জাতিক আইনের নিয়ম অনুসারে মিত্র বাহিনীর পছন্দের ঐ সব আইন মানতে তাদের বাধ্যবাধকতা ছিল না। মস্কো ও পোস্টডাম ডিক্লারেশন ছিল মিত্র বাহিনীর একতরফা সিদ্ধান্ত। তারপরও বিজয়ী রাষ্ট্রসমূহ আইন প্রযোগের নীতি অমান্যকরে পরাজিত জার্মান ও জাপানের সৈন্যদের বিচার করে।
২. মিত্র বাহিনীর পক্ষে বিচারের নৈতিক ভিত্তি হিসেবে অবশ্য আত্মসমর্পন দলিলে দোষী ব্যাক্তিদের বিচারের উল্লেখ থাকার বিষয়ে জোর দেয়া হয়, যা ছিল পক্ষপাতিত্বপূর্ণ। দলিলে কেবল পরাজিত জার্মানদের বিচারের কথা উল্লেখ করা হয়, মিত্রবাহিনীর কৃত যুদ্ধপরাধের বিচার চেপে যাওয়া হয়, বিজয়ী হওয়ার কারণে। ফলে নূরেনবার্গ বিচার পরিণত হয় বিজয়ীর একতরফা বিচারে।
৩. মিত্রপক্ষ নিজেরাই বিমান হামলার নামে যুদ্ধপরাধে জড়িত থাকায়, নিজেদের রক্ষার জন্যে তারা লন্ডন চার্টারে আকাশ থেকে নিক্ষেপিত বোমাবর্ষনকে ইচ্চাকৃতভাবে রেখেছিল যুদ্ধপরাধের সংজ্ঞার বাইরে। উল্লেখযোগ্য যে ঐ সময় বৃটেন ও আমেরিকার বিরুদ্ধেও যুদ্ধপরাধের অভিযোগ উঠে। বিশেষত জার্মানীর ড্রেসডেন শহরে বৃটিশবাহিনী কর্তৃক বোমাবর্ষন করে ১০ হাজার নীরিহ জনগণকে হত্যা করা এবং আমেরিকা কর্তৃক নাগাসাকি ও হিরোশিমা শহরে আনবিক বোমাবর্ষণ করে লক্ষাধিক নীরিহ বেসামরিক লোক হত্যা জার্মানীর প্রচন্ড দুস্কর্মকে ছাড়িয়ে গেলেও আকাশযুদ্ধ যুদ্ধপরাধের অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় এসব গুরুতর নজীরবিহীন অপরাধের বিচার হয়নি।
আনবিক বোমা বর্ষনের পর নাগাসাকি শহর
যুদ্ধবিধ্বস্ত ড্রেসডেন শহর
 ড্রেসডেনে বোমা বর্ষনের আদেশ দিয়েছিলেন এয়ার চিফ মার্শাল স্যার আর্থার হ্যারিস (Arthur Harris), ড্রেসডেনের ঘটনার পর তিনি পরিচিতি লাভ করেন বোমা হ্যারিস (Bomber Harris) নামে। এ ঘটনায় চাচিল দায়ি থাকলেও তিনি এর দায় নিজ কাঁধে নিতে রাজি হননি। ১৯৪৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মিত্রপক্ষের বিমান হামলায় বাল্টিক বন্দর সুইনমুন্ডে (Swinemunde) অবস্থিত একটি হাসপাতালে মারা যায় প্রায় ২০ হাজার অসুস্থ শরণার্থী।
৪. জার্মান সৈন্য ও সাধারণ জনগণকে নির্বিচার হত্যার কারণে জার্মানের প্রতি ৫ জনের ১ জন ২য় বিশ্বযুদ্ধে প্রাণ হারায়। জার্মান ঐতিহাসিক জর্গ ফ্রেডারিক (Jorg Friedrich) উল্লেখ করেছেন যে যুদ্ধের শেষ ৩ মাসেই প্রাণ হারায় জার্মানীর ৭ লক্ষ সৈন্য, যা নজীরবিহীন নির্বিচার হত্যার ফসল। কিন্তু পরাজিত জার্মানীর পক্ষে ঐ সময়, তাদের উপর অত্যাচারের বিচার চাওয়ার কোন সূযোগ ছিল না।
৫. নূরেনবার্গ ট্রায়েলের আইনগত বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। যেকোন দেশের আইন ব্যবস্থায় কোন কাজকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয় ঐ কাজকে আইনদ্বারা অপরাধ ঘোষণার পর থেকে (nullum crimen sinelege, also called the retro-activity rule)। নূরেনবার্গ ট্রায়েলে ১৯৪৫ সালে প্রণীত লন্ডন চার্টারের ভিত্তিতে ১৯৪৫ সালের আগে সংঘটিত কাজকে অপরাধগণ্যে বিচার করায় খোদ তৎকালীন মার্কিন প্রধান বিচারপতি Harlan Fiske Stone নূরেনবার্গ ট্রায়ালকে ফ্রড বলে অভিহিত করেন। নূরেনবার্গ ট্রায়ালে জেনেভা কনভেনশন ভঙ্গের অভিযোগও আনা হয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জেনেভা কনভেনশন সেই সব রাষ্ট্রের উপর প্রয়োগ হয়, যারা এই কনভেনশনসমূহ রেটিফাই করেছে। নূরেনবার্গ ট্রায়ালের অন্যতম পক্ষ রাশিয়া জেনেভা কনভেনশন রেটিফা্ই না করেই বিচারের অন্যতম পক্ষ হয়েছিল। নূরেনবার্গ ট্রায়ালের বড় ত্রুটি ছিল বিচারপতিদের কেবলমাত্র বিজয়ী দেশসমূহ থেকে নির্বাচন করা। ফলে বিচারপতিদের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ ছিল।
৬. যেসব অপরাধে জার্মানদের বিচার হয় মিত্রশক্তিও এই অভিযোগে কম-বেশি দায়ি ছিল। যুদ্ধপরাধের যেসব সংজ্ঞা লন্ডন চার্টারে ছিল, ঐ সংজ্ঞায় বর্ণিত একই অপরাধ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও রাশিয়া। রাশিয়া কোন উস্কানি ছাড়াই আক্রমণ করেছিল জার্মান, দখল করেছিল পোলান্ড এবং হাজার হাজার পোলান্ডবাসীকে হত্যা করেছিল কাটিন (Katyn) নামক বনভূমিতে।
কাটিন বনভূমি হত্যাযজ্ঞ
 প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট যুদ্ধচলাকালীন সময়ে প্রায় ১ লাখ জাপানি আমেরিকানকে যুক্তরাষ্ট্রে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে আটক রাখেন দীর্ঘদিন। নূরেনবার্গের ১ম বিচার চলাকালে অভিযুক্ত জার্মান নৌবাহিনীর সুপ্রীম এডমিরাল কার্ল ডনেটজ-এর বিরুদ্ধে প্রশান্ত মহাসাগরস্থিত আমেরিকান নৌ বাহিনীর প্রধান এডমিরাল চেস্টার নিমিটজ সাক্ষ্যদান কালে স্বীকার করেন যে, যে নীতি অনুসরণ করে আমেরিকার নৌবাহিনী জাপানের বিরুদ্ধে নৌযুদ্ধ সংগঠিত করছে, জার্মান নৌবাহিনীর নীতি তার থেকে পৃথক ছিল না। এ তথ্য প্রকাশ পেলে, নিজেদের অপরাধমূলক কার্যক্রম ঢাকতে কার্ল ডনেটসকে নৌযুদ্ধের অপরাধের অভিযোগ থেকে খালাস দেয়া হয়।
মোট কথা ২য় বিশ্বযুদ্ধের উভয়পক্ষ কমবেশি যুদ্ধপরাধের জন্যে দায়ি ছিল। তবে যুদ্ধে জয়ী হওয়ার একটা সুবিধা হলো, পরাজিত বা আত্মসমর্পনের পর বিজিত দেশ বা দেশসমূহের জয়ী দেশের বিরুদ্ধে কিছু করার মতো শক্তি থাকে না। এ কারণে যুদ্ধপরাধের জন্যে জয়ী দেশের কাঠগড়ায় দাড়াতে হয় পরাজিত লোকজনকে। এটা যেমন ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় সত্যি ছিল, তেমনি সেটা আজো সত্যি। অন্যথায় আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র মিথ্যা অভিযোগে ইরাক আক্রমণ ও ধ্বংস সাধনের জন্যে বিচারের হাত থেকে রেহাই পেতো না। তবে নূরেনবার্গ ট্রায়ালের ইতিবাচক দিক হলো যে ট্রাইবুনালের বিচারকরা যথাসাধ্য নিরপেক্ষতা বজায় রেখে বিচার কার্য পরিচালনা করেছেন, অভিযুক্তদেরকে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্যে যথাসাধ্য সূযোগ দেয়া হয়েছে এবং একটি বিচার পদ্ধতি অনুসরণ করে সাক্ষ্যসাবুদের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। ফলে ত্রুটিমুক্ত না হলেও, নূরেনবার্গ ট্রায়ালস বিশ্বসমাজে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেছে এবং বিশ্বের যুদ্ধ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক আইনের অগ্রগতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।

নূরেনবার্গ নীতিমালা

জাতিসংঘ গঠনের প্রথম দিকে সাধারণ পরিষদকে কোন আন্তর্জাতিক আইন প্রণয়নের ক্ষমতা প্রদানের বিরোধীতা করেছিল অংশগ্রহণকারি রাষ্ট্রসমূহ। তবে আন্তর্জাতিক আইন বিষয়ে গবেষণা ও সুপারিশ প্রণয়নের সীমিত ক্ষমতা দেয়ার বিষয়ে জোরালো সমর্থন থাকায় চার্টারের ৪র্থ চ্যাপ্টারে ১৩ নং অনুচ্ছেদ সংযোজন করে সাধারণ পরিষদকে আন্তর্জাতিক আইনের ক্ষেত্রে গবেষণা, সুপারিশ প্রণয়ন এবং আইন কোডিফিকেশনের দায়িত্ব প্রদান করা হয়। নূরেনবার্গ নীতিমালা (The Nuremberg Principles) এই ক্ষমতার ফসল। ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের গৃহীত ১৭৭ (২) (এ) সিদ্ধান্ত অনুসারে আন্তর্জাতিক আইন কমিশনকে দায়িত্ব প্রদান করা হয় নূরেনবার্গ ট্রাইবুনালের চার্টার ও রায়ের প্রতিফলন ঘটিয়ে আন্তর্জাতিক আইনের নীতিমালা প্রণয়নের। সে অনুযায়ী আন্তর্জাতিক আইন কমিশন যে নীতিমালা সংকলন করে সেটাই নূরেনবার্গ নীতিমালা হিসেবে পরিচিত। মোট ৭ টি নীতির সামাহার হচ্ছে নূরেনবার্গ নীতিমালা; ৭ টি নীতি নিম্নে বর্ণনা করা হলো:
নীতি নং ১. কোন ব্যাক্তি এমন কোন কাজ করেন যা আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে অপরাধ হিসেবে বিবেচিত, সেক্ষেত্রে ঐ ব্যাক্তি কৃতকর্মের জন্যে দায়ি এবং শাস্তির সম্মুখীন হবেন। ("Any person who commits an act which constitutes a crime under international law is responsible therefore and liable to punishment.")
নীতি নং ২. কোন দেশের অভ্যন্তরীন আইনে দন্ডযোগ্য নয় এমন কোন কর্ম আন্তর্জাতিক আইনে অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হলে, যে ব্যাক্তি এমন কর্ম সংগঠিত করেছেন, তিনি আন্তর্জাতিক আইনে তার কৃতকর্মের দায় এড়াতে পারবেন না। ("The fact that internal law does not impose a penalty for an act which constitutes a crime under international law does not relieve the person who committed the act from responsibility under international law.")
নীতি নং ৩. কোন ব্যাক্তি যিনি এমন কোন কর্ম করেছেন যা আন্তর্জাতিক আইনে অপরাধ হিসেবে বিবেচিত, তিনি রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তার পদাধিকারের দোহাই দিয়ে আন্তর্জাতিক আইনের অপরাধের দায় থেকে রেহাই পাবেন না। ("The fact that a person who committed an act which constitutes a crime under international law acted as Head of State or responsible government official does not relieve him from responsibility under international law.")
নীতি নং ৪. নৈতিক বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্র উপস্থিত থাকলে, কোন ব্যাক্তি সরকারের আদেশ অথবা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার আদেশানুযায়ী কৃতকাজের দোহাই দিয়ে আন্তর্জাতিক আইনের দায় এড়াতে পারবেন না। ("The fact that a person acted pursuant to order of his Government or of a superior does not relieve him from responsibility under international law, provided a moral choice was in fact possible to him".)
নীতি নং ৫. আন্তর্জাতিক আইনে অভিযুক্ত ব্যাক্তি ঘটনার বিবরণ ও আইনের ক্ষেত্রে ন্যায় বিচার লাভ করার অধিকার ভোগ করবেন। ( "Any person charged with a crime under international law has the right to a fair trial on the facts and law.")
নীতি নং ৬.  নিম্নবর্ণিত অপরাধসমূহ আন্তর্জাতিক আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে:
(ক) শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ : আক্রমণাত্মক যুদ্ধ বা আন্তর্জাতিক ট্রিটি, চুক্তি অথবা নিশ্চয়তা ভঙ্গ করে কোন আগ্রাসী যুদ্ধের পরিকল্পনা, প্রস্তুতি, পদক্ষেপ বা লিপ্ত হওয়া; বা ঐ সব কর্মের যে কোন কর্ম সংগঠনে কোন যৌথ পরিকল্পনা বা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হওয়া।
(খ) যুদ্ধপরাধ: যুদ্ধের আ্ইন বা প্রচলিত প্রথা লঙন, যথা হত্যা, শ্রমদাসত্ব অথবা দখলাধীন এলাকার বেসামরিক জনগণের প্রতি অমানবিক ব্যবহার বা তাদের নির্বাসিত করা, যুদ্ধবন্দী বা সমুদ্রে থাকা লোকদের হত্যা বা তাদের প্রতি অমানবিক আচরণ, হোস্টেজদের হত্যা, সরকারি বেসরকারি সম্পদ ধ্বংস; নগর শহর অথবা গ্রাম অথবা সামরিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ নয় এমন সব স্থান নির্বিচারে ধ্বংস সাধন।
(গ) মানবতাবিরোধী অপরাধ: শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ অথবা যুদ্ধপরাধ সংগঠিত করার ধারাবাহিকতায় বেসামরিক জনসাধারণকে হত্যা, নির্মূলকরণ, দাসত্বে নিয়োজত করণ, নির্বাসিত করণ এবং অন্যান্য অমানবিক আচরণ অথবা রাজনৈতিক, জাতিগত বা ধর্মীয় কারণে কাউকে অভিযুক্ত করণ। (Murder, extermination, enslavement, deportation and other inhumane acts done against any civilian population, or persecutions on political, racial, or religious grounds, when such acts are done or such persecutions are carried on in execution of or in connection with any crime against peace or any war crime.)
নীতি নং ৭. শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ, যুদ্ধ পরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের সহযোগীতা করাও আন্তর্জাতিক আইনে অপরাধ।

জেনেভা কনভেনশন

 সাধারণভাবে কনভেনশন লোকজনের কোন সমাবেশকে বুঝায়। তবে কূটনৈতিকভাবে কনভেনশনের অর্থ হচ্ছে আন্তর্জাতিক চুক্তি। জেনেভা কনভেনশন বলতে যুদ্ধকালীন সময়ে নানা পরিস্থিতিতে বেসামরিক জনগণ, সামরিক বাহিনী, ধর্ম এবং চিকিৎসাক্ষেত্রে নিয়োজিত কর্মীবৃন্দের প্রতি যুদ্ধরত দেশের আচরণ সংক্রান্ত চুক্তি। জেনেভা কনভেনশন ৪টি চুক্তি এবং ৩টি প্রটকলের সমাহার যা যুদ্ধপরাধ আইনের বিবর্তনের ধারায় ২য় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে জেনেভা কনভেনশন আন্তর্জাতিক আইনে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। উল্লেখ্য ১ম জেনেভা কনভেনশন ১৮৬৪ সালে সেনাবাহিনীর আহত ও রুগ্ন সৈন্যদের নিরাপত্তার জন্যে প্রণীত হয়। ২য় জেনেভা কনভেনশন ১৯০৬ সালে সমুদ্রে সশস্ত্র বাহিনীর আহত, রুগ্ন ও ডুবন্ত জাহাজের সৈন্যদের নিরাপত্তার জন্য প্রণীত হয়। ৩য় জেনেভা কনভেনশন ১৯২৯ বন্দী সৈন্যদের চিকিৎসার জন্য প্রণীত হয়। তবে ২য় বিশ্বযুদ্ধের পর বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে আলাপ আলোচন ও দরকষাকষির পর ১৮৬৪, ১৯০৬ এবং ১৯২৯ সালের ৩টি কনভেনশনকে যুগোপযোগী করে এবং যুদ্ধে বেসামরিক জনগণের নিরাপত্তা বিধানের জন্যে ৪র্থ জেনেভা কনভেনশন ১৯৪৯ প্রণীয়ন করে নূতন করে অনুমোদন  করা হয়। 

এভাবে অতীতের ৩টি কনভেনশনের সময়কাল পরিবর্তিত হয়ে সেগুলো ১৯৪৯ সালের প্রণীত হিসেবে বর্তমানে বিবেচিত। ফলে সবকটি কনভেনশন যথা ১ম জেনেভা কনভেনশন ১৯৪৯, ২য় জেনেভা কনভেনশন ১৯৪৯ এবং ৩য় জেনেভা কনভেনশন ১৯৪৯ নামে পরিচিত। ৪টি কনভেনশন ছাড়াও জেনেভা কনভেনশনের রয়েছে ৩টি প্রটকল। ১৯৭৭ সালের দুটো প্রটকলে কোন দেশের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধকেও কনভেনশনের আওতায় আনা হয়। ৩য় প্রটোকল গৃহীত হয় ২০০৫ সালে। জেনেভা কনভেনশন ঐসব রাষ্ট্রের উপর প্রয়োগযোগ্য যারা এই কনভেনশন মেনে স্বাক্ষর করেছে। জেনেভা কনভেনশন বলতে এককভাবে তাই ৪টি কনভেনশন এবং ৩টি প্রটোকলকে বুঝায়। প্রটোকল ১প্রটোকল ২ ১৯৭৭ সালে এবং প্রটোকল ৩ ২০০৫ সালে প্রণয়ন করা হয়।

জেনেভা কনভেনশনের ৪ টি কনভেনশনের রয়েছে ২টি নীতিমালা, যা বর্ণিত হয়েছে প্রতিটি কনভেনশনের ২ ও ৩ অনুচ্ছেদে। ২নং নীতিমালাটি আন্তর্জাতিক সামরিক সংঘাতের সাথে এবং ৩নং নীতিমালা অ-আন্তর্জাতিক সংঘাতের সাথে সম্পর্কিত। ২নং নীতিমালা অনুযায়ী যুদ্ধরত জাতিগুলোর মধ্যে কমপক্ষে একটি দেশও কনভেনশন অনুমোদন দিয়ে থাকলে, আন্তর্জাতিক সংঘাতের প্রতিটি ক্ষেত্রেই জেনেভা কনভেনশনের প্রয়োগ হবে, তবে শর্ত থাকে যে যেখানে বিরোধী দেশটি কনভেনশনে স্বাক্ষর  না করলেও এর ধারাগুলোকে "গ্রহণ ও প্রয়োগ" করেছে। ১৯৭৭ সালের প্রটোকল ১-এর ১ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ঔপনিবেশিক শাসন ও বিদেশী দখলদারিতার বিরুদ্ধে সামরিক সংঘাতও আন্তর্জাতিক সংঘাত হিসাবে বিবেচিত হবে। কনভেনশনসমূহের অভিন্ন ৩ নং অনুচ্ছেদ মোতাবেক একটিমাত্র দেশের সীমানার ভেতরে সীমাবদ্ধ এবং প্রকৃতিতে আন্তর্জাতিক নয় এ রকমের সামরিক সংঘাতের জন্যেও যুদ্ধ-সম্পর্কিত কনভেনশনের নূন্যতম কিছু বিধি প্রযোজ্য।
জেনেভা কনভেনশনের প্রয়োগের দায়িত্ব জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের উপর। কিন্তু নিরাপত্তা পরিষদ কদাচিৎ জেনেভা কনভেনশন সম্পর্কে এর কর্তৃত্ব প্রয়োগ করে, বেশিরভাগ বিষয়েরই সুরাহা হয় আঞ্চলিক চুক্তি অথবা জাতীয় আইনের সাহায্যে। সেজন্যে বিশ্বের জাতিসমূহের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধে জেনেভা কনভেনশনের অবদান উল্লেখযোগ্য নয়। জেনেভা কনভেনশন স্বাক্ষরিত হওয়ার পরে অনুষ্ঠিত হয়েছে, ভিয়েতনামযুদ্ধ, ভারত-চীন যুদ্ধ, পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধ, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ, আফগান যুদ্ধ, ইরাক আগ্রাসন, চেচনিয়া আগ্রাসন, রাশিয়া-জর্জিয়া যুদ্ধ। ভিয়েতনাম যুদ্ধে আমেরিকা, সোভিয়েত রাশিয়া, চীন জড়িত থাকায় সেখানে সংঘটিত গণহত্যা ও বেসামরিক জনগণের উপর বোমাহামলাসহ নানা উপদ্রবের জন্যে বিচার দূরের কথা কোন কমিশনও গঠিত হয়নি। কেবল মাইলাই গ্রামের ভয়াবহ গণহত্যা মিডিয়ায় ব্যাপক আলোড়ণ তুললে, আমেরিকা তার অভ্যন্তরীণ আইনে মূল আসামীদের বাদ দিয়ে বলির পাঠা হিসেবে ল্যাফটেন্যান্ট কেরীকে যৎসামান্য শাস্তি দিয়ে দায়িত্ব শেষ করে।
যুদ্ধ বন্ধে জেনেভা কনভেনশনের সাফল্য উল্লেখযোগ্য না হলেও, ১৯৪৯ সালে চতুর্থ জেনেভা কনভেনশন সম্পাদনের পর থেকে যুদ্ধ ও যুদ্ধ সংঘটনের প্রকৃতি যদিও নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। যুদ্ধের ভয়াবহতা, নৃশংসতা ও নিষ্ঠুরতা রোধে মানবহিতৈষী আইন হিসেবে জেনেভা কনভেনশনের অবদান অনস্বীকার্য। যুদ্ধবন্দী, অসুস্থ যোদ্ধা, বেসামরিক জনগণের জানমাল রক্ষার্থে জেনেভা কনভেনশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সাম্প্রতিককালের সব আন্তর্জাতিক সামরিক সংঘাতে কনভেনশনের চুক্তিগুলো কার্যকর করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আফগানিস্তান যুদ্ধ (২০০১ - বর্তমানকাল), ২০০৩ এর ইরাক আগ্রাসন, চেচনিয়া আগ্রাসন (১৯৯৪ - বর্তমানকাল), এবং ২০০৮ এর রাশিয়া-জর্জিয়া যুদ্ধ।

রোম স্ট্যাটুস ও আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত (ICC)

 যুদ্ধপরাধে অভিযুক্তদের জন্যে সর্বপ্রথম একটি আন্তর্জাতিক আদালত গঠনের সুপারিশ করেছিল ১ম বিশ্বযুদ্ধের পর গঠিত কমিশন অব রেসপনসিবিলিটি। তাদের সুপারিশে আরো ছিল ১ম বিশ্বযুদ্ধে সংগঠিত যুদ্ধপরাধের জন্যে রাষ্ট্রপ্রধানদের দায়মুক্তি না দেয়া এবং যুদ্ধে জয়লাভকারি ৫টি বৃহৎ শক্তি থেকে ৫জন করে এবং অন্যান্য দেশ থেকে  ৬টি দেশ থেকে একজন করে মোট ২২ জন বিচারকের সমন্বয়ে আন্তর্জাতিক আদালত গঠন করার প্রস্তাব। যুক্তরাষ্ট্র এই প্রস্তাবের রাষ্ট্রপ্রধানদের বিচারের সুপারিশের বিরোধীতা করেছিল এবং এ মত প্রকাশ করেছিল যে আইনের ভূতাপেক্ষ প্রয়োগ ন্যায় বিচারের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। জাপানও বিরোধীতা করেছিল রাষ্ট্রপ্রধানদের বিচারের আওতায় আনয়নের প্রস্তাব। কমিশন অব রেসপনসিবিলিটির সুপারিশ ১৯৩৭ সালের নভেম্বর মাসে (১-১৬ নভেম্বর) জেনেভায় অনুষ্ঠিত লীগ অব নেশনসের সভায় উত্থাপন করা হলে ১৩টি সরকার তাতে স্বাক্ষর দান করে। কিন্তু পরবর্তীতে কোন সরকার তা অনুস্বাক্ষর বা রেটিফাই না করায় এটি কার্যকারিতা লাভ করেনি।
নূরেনাবার্গ ও টোকিও ট্রায়ালের পটভূমিতে ১৯৪৮ সালে সর্বপ্রথম যুদ্ধপরাধের বিচারের জন্যে একটি স্থায়ী আদালত প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা স্বীকৃত হয় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে। সাধারণ পরিষদের অনুরোধে আন্তর্জাতিক আইন কমিশন দুটো স্ট্যাটুস ১৯৫০ সালে প্রণয়ন করলেও পূজিবাদী ও সমাজতন্ত্রী দেশসমূহের মধ্যে স্নায়ূযুদ্ধের কারণে, সেটা আর আলোর মুখ দেখতে পারেনি।
আন্তর্জাতিক আইন কমিশন
১৯৮৯ সালে মাদক পাচার রোধে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত গঠনের প্রস্তাবকে পুনরুজ্জীবিত করে ত্রিনিদাদ ও টোবাগো। এর প্রেক্ষিতে সাধারণ পরিষদ আন্তর্জাতিক আদালত গঠনের আইন প্রণয়নের কাজ পুনরুজ্জীবিত করার অনুরোধ জানায় আন্তর্জাতিক আইন কমিশনকে। এর মধ্যে শুরু হয় বসনিয়া-হার্জেগোবিনিয়া-ক্রোশিয়া এবং রুয়ান্ডায় মর্মান্তিক গৃহযুদ্ধ।
নূরেনবার্গ ট্রায়ালে প্রায় ৫০ বছর পর ১৯৯৩ সালের মে মাসে বলকান এলাকা কেবল রণক্ষেত্র নয়, স্মরণকালের গণহত্যা, জাতিগত সহিংসতা ব্যাপকাকার ধারণ করে। জাতিগতনির্মূল ঠেকাতে ও শান্তি স্থাপনের জন্যে নিরাপত্তা পরিষদ অর্পিত ক্ষমতাবলে আইসিটিওয়াই (International Criminal Tribunal for the Prosecution of Persons Responsible for Serious Violations of International Humanitarian Law Committed in the Territory of the Former Yugoslavia since 1991) গঠন করে। দি হ্যাগ শহরে এ আইনের অধিনে সার্বনেতা ও সেনাপতিদের বিচার চলমান রয়েছে।
১৯৯৪ সালে রূয়ান্ডায় হুটু ও তুতসি সম্প্রদায়ের মধ্যে গণহত্যা ও জাতিগত সহিংসতা ব্যাপকাকার ধারণ করলে গণহত্যার বিচারের জন্য নিরাপত্ত পরিষদ গঠন করে আইসিটিআর (International Criminal Tribunal for the Prosecution of Persons Responsible for Genocide and Other Serious Violations of International Humanitarian Law Committed in the Territory of Rwanda.) এদুটো ট্রাইবুনালই গঠনের দিক দিয়ে ছিল আন্তর্জাতিক। এছাড়া ট্রাইবুনালের অবস্থান ছিল সংশ্লিষ্ট দেশের বাইরে, দি হেগ ও তানজানিয়ার একটি শহরে এবং শাস্তির ক্ষেত্রে মৃত্যুদন্ড রহিত ছিল। এছাড়া ছিল আসামীদের আত্মপক্ষ সমর্থনের অবাধ অধিকার। তবে এ দুটো ট্রাইবুনালই গঠিত হয় অস্থায়ী ভিত্তিতে। এ দুটো অস্থায়ী আদালত গঠনের মধ্য দিয়ে একটি স্থায়ী আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত স্থাপনের যৌক্তিকতা সব মহলের সমর্থন লাভ করে।
ইতিমধ্যে একক উদ্যোগে বেলজিয়াম বিশ্বের যেকোন স্থানে সংগঠিত যুদ্ধাপরাধের জন্যে নিজদেশে বিচারের জন্যে আইন প্রনয়ণ করে ১৯৯৩ সালে (এ আইনে দুজন রোয়ান্ডান নার্সকে দোষী সাব্যস্থ করে দন্ডদান করা হয়। কিন্তু বেলজিয়াম কর্তৃক আন্তর্জাতিক ফৌজাদরি অপরাধের বিচার আন্তর্জাতিক বিচারাদালত ২০০২ সালে অবৈধ ঘোষণা করে রায় প্রদান করলে বেলজিয়াম আইনটি নিজ দেশের জন্যে প্রয়োগযোগ্য করে নূতন করে বিন্যস্ত করে)। বাংলাদেশও ১৯৭৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ তথা যুদ্ধপরাধের বিচারের জন্যে একটি দেশিয় আইন প্রণয়ন করে যা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল ১৯৭৩ নামে পরিচিত।
এই পটভূমিতে আন্তর্জাতিক আইন কমিশন ১৯৯৪ সালে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত (ICC) গঠনের জন্যে স্ট্যাটুস-এর চূড়ান্ত খসড়া দাখিল করে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে। এরপর আইন কমিশনের খসড়া নিয়ে শুরু হয় দীর্ঘ আলোচনা, দরকষাকষি, সভা-শুনানীর। অবশেষে ১৯৯৮ সালের ১৭ জুলাই ইতালির রোম শহরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ আযোজিত সন্মেলনে নিজেদের মধ্যে শলা পরামর্শ করে ১২০ দেশ আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত বা আইসিসির জন্যে রোম স্ট্যাটুস অনুমোদনে সম্মতিদান করায় যুদ্ধপরাধের বিচারে জাতিসংঘ কর্তৃক একটি স্থায়ী আদালত স্থাপনের প্রচেষ্টা সাফল্য লাভ করে। তবে সন্মেলনে প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেয় চীন, ইরাক, ইসরায়েল, লিবিয়া, কাতার, ইয়েমন ও যুক্তরাষ্ট্র এবং ২১ দেশ বিরত থাকে ভোট দেয়া থেকে।
হেগ শহরে আইসিসি-এর সদর দপ্তর
জাতিসংঘের যেকোন চুক্তি আইনে পরিণত হওয়ার জন্যে তা শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে পাশ হওয়াই যথেষ্ঠ নয়, তার নির্দিষ্ঠ সংখ্যক সদস্য রাষ্ট্রের অনুসমর্থন বা রেটিফিকেশনের প্রয়োজন হয়। রোম স্ট্যাটুস ১৯৯৮ সালে পাশ হলেও তা আন্তর্জাতিক বাধ্যতামূলক আইনে পরিণত হওয়ার জন্যে প্রয়োজন ছিল ৬০টি সদস্য রাষ্ট্রের অনুসমর্থন। রোম স্ট্যাটুস ৬০টি দেশের অনুসমর্থন লাভ করে ২০০২ সালের ১১ এপ্রিল এবং রোম স্ট্যাটুস আইনগতভাবে কার্যকর হয় ২০০২ সালের ১ জুলাই থেকে হেগ শহরে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতের কার্যক্রম শুরুর মাধ্যমে।  আইসিসি-এর প্রথম বেঞ্চ গঠিত হয় অনুসমর্থনকারি দেশগুলোর ভোটে নির্বাচিত ১৮ জন বিচারক নিয়ে। বিচারকবৃন্দ ২০০৩ সালের ১১ মার্চ উদ্বোধনী সেশনে শপথ গ্রহণ করেন এবং বিচারের জন্যে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে প্রএম গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন ২০০৫ সালের ৮ জুলাই। হেগ শহরে স্থাপিত আন্তর্জাতিক ফৌজাদারি আদালতের এই অগ্রযাত্রাই আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে মানবজাতির ইতিহাসে সর্বশেষ অগ্রগতি।
 

রোম স্ট্যাটুস-এর বৈশিষ্ঠসমূহঃ

১. দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর লন্ডন চার্টারে যুদ্ধপরাধ ছিল ৩ ধরণের, যথা: আক্রমণাত্মক যুদ্ধের মাধ্যমে শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ, যুদ্ধপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ। কিন্তু রোম স্ট্যাটুসের ৩ নং আর্টিকেলের ১ ধারায় যুদ্ধ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক অপরাধকে ৪ ভাগে বিভক্ত করা হয়, যথা: গণহত্যা, মানবতার বিরোধী অপরাধ, যুদ্ধপরাধঅন্যায় যুদ্ধ শুরু করার অপরাধ
ক. আর্টিকেল ৬ মোতাবেক গণহত্যা হলো কোন জাতি, নৃতাত্বিক, সাম্প্রদায় বা ধর্মীয় গোষ্ঠী আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস সাধন, মারাত্মক ধরণের শারীরিক বা মানসিক ক্ষতিসাধন, তাদের সন্তান উৎপাদন ব্যাহত করণ এবং বলপূর্বক এক সম্প্রদায়ের সন্তানদেরকে অন্য সম্প্রদায়ে অন্তর্ভুক্তকরণ।  
খ. মানবতাবিরোধী অপরাধের সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে ৭ অনুচ্ছেদে। এ অনুচ্ছেদ মোতাবেক মানবতা বিরোধী অপরাধ হচ্ছে বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে পরিচালিত বহুবিস্তৃত বা প্রণালীবদ্ধভাবে আক্রমণ। যথা: খুন, নিশ্চিহ্ন করণ ((Extermination) ), দাসত্বে নিয়োজিত করণ, নির্বাসিত করণ বা শক্তিপ্রয়োগে বিতাড়িত করণ, আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নিয়ম ভঙ্গ করে বন্দী করা বা শারিরীক স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করণ, অত্যাচার উৎপীড়ণ, ধর্ষণ, যৌন দাসত্ব, গণিকাবৃত্তিতে বলপূর্বক নিয়োজিত করণ, বল পূর্বক গর্ভ ধারণে বাধ্য করণ বা বন্ধ্যাকরণ অথবা অন্যকোন ধরণের গুরুতর যৌন অপরাধ সংগঠন, বর্ণবাদের আশ্রয়গ্রহণ, গুম বা অপহরণ, অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে এ ধরণের কোন অমানবিক কার্য সংগঠন যা মারাত্মক নির্যাতন অথবা শারীরিক গুরুতর জখম বা শারীরিক মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যে গুরুতর হুমকী সৃষ্টি করে এমন কাজ করা ।
গ. যুদ্ধপরাধের সংজ্ঞা বিস্তারিতভাবে দেয়া হয়েছে ৮নং আর্টিকেলে। এ অনুচ্ছেদ মোতাবেক কোন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বা নীতিগত অবস্থানের কারণে অথবা বৃহৎ আকারে সংগঠিত এই অপরাধ আদালতে বিচারযোগ্য। আর যেসব বিষয় যুদ্ধপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে, সংক্ষেপে সেগুলো হচ্ছে: ১৯৪৯ সালের ১২ আগস্ট তারিখের জেনেভা কনভেনশনের গুরুতর লঙ্ঘন, প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক আইন কাঠামোর আওতায় আন্তর্জাতিক সশস্ত্র সংঘর্ষে প্রযোজ্য আইন ও প্রথার গুরুতর লঙ্ঘন এবং যেসব সশস্ত্র সংঘর্ষ আন্তর্জাতিক বৈশিষ্ঠমন্ডিত নয় (কোন দেশের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ বা কোন দেশের শান্তিশৃংখলা রক্ষার্থে কোন কার্য আন্তর্জাতিক সংঘর্ষ হিসেবে বিবেচিত হবে না), সেই সব ক্ষেত্রে ১৯৪৯ সালের ১২ আগস্ট তারিখের জেনেভা কনভেনশনসমূহের সাধারণ অনুচ্ছেদ নং ৩-এর লঙ্ঘন।
ঘ. সশস্ত্র আক্রমণ জনিত অপরাধ (crime of aggression)-এর উল্লেখ ৫ নং আর্টিকেলে থাকলেও অন্যান্য আন্তর্জাতিক অপরাধের মতো এ অপরাধের সংজ্ঞা নির্ধারণ করায় সংকট দেখা দেয়। এ অপরাধের সংজ্ঞা নির্ধারণ করতে সদস্যদেশগুলোর মধ্যে তীব্র মতানৈক্য থাকার কারণে স্ট্যাটুসসে এর সংজ্ঞা দেয়া যায়নি। তবে রোম স্ট্যাটুস হালনাগাদ করার লক্ষ্যে উগান্ডার কাম্পালা শহরে ২০১০ সালের ৩১ মে থেকে ১১ জুন পর্যন্ত অনুষ্ঠিত কনফারেন্সে সশস্ত্র আক্রমণ জনিত অপরাধের (crime of aggression) একটি সংজ্ঞা শেষ পর্যন্ত গ্রহণ করা সম্ভব হয়েছে। এই কনফারেন্সে যে সংজ্ঞা গৃহীত হয়, সে অনুসারে অন্যএকটি দেশের সার্বভৌমত্ব, আঞ্চলিক অখন্ডতা বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার উপর সামরিক শক্তি প্রয়োগের পরিকল্পনা, উদ্যোগ, অভিপ্রায় বা বলবৎকরণ সশস্ত্র আক্রমণজনিত অপরাধ (crime of aggression) হিসেবে বিবেচিত হবে। এছাড়া জাতিসংঘের চার্টার অমান্যক্রমে অন্যদেশের উপর সশস্ত্র আক্রমণ, সামরিক দখলদারিত্ব, শক্তিপ্রয়োগের মাধ্যমে এলাকা সংযুক্তি, বন্দর বা উপকূল ব্লকেড করাও এ অপরাধের অন্তর্ভূক্ত হবে।

২. ১১(১) অনুচ্ছেদে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে কেবল রোম স্ট্যাটুসের আইন বলবৎ হওয়ার দিন ও তারপরে সংগঠিত অপরাধের বিচার করা যাবে। অনুচ্ছেদ ২৩-এ Nullum crimen sine lege নীতি স্বীকৃত হয়েছে। স্ট্যাটুসের ২৪(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে স্ট্যাটুস বলবৎ হওয়ার আগে করা কোন কাজের জন্যে কাউকে দায়ী করা যাবে না (Non-retroactivity ratione personae)। অর্থাৎ আইনের ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা দেয়া হয়নি। ২০০২ সালের ১১ এপ্রিল রোম স্ট্যাটুস বলবৎ হওয়ায় ঐ দিন এবং তারপরে সংগঠিত কোন আন্তর্জাতিক অপরাধ এই আদালতে বিচারযোগ্য হবে।
৩. স্ট্যাটুসের ৬৬ (১) অনুচ্ছেদে আদালত কর্তৃক দোষী ঘোষণার পূর্বে সকল অভিযুক্তকে নির্দোষ হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং ৬৬(২) অনুচ্ছেদে কোন ব্যাক্তিকে দোষী প্রমানের দায় বাদীপক্ষের উপর ন্যাস্ত করা হয়েছে।
৪. স্ট্যাটুস-এর ৬৭ (১) বি অনু্চ্ছেদে আসামীপক্ষকে তাদের ডিফেন্স প্রস্তুতীর জন্যে পর্যাপ্ত সময় প্রদান সহ নিজের পছন্দকৃত বিশ্বস্ত আইনজীবির সাথে বাধাহীন যোগাযোগের অধিকার প্রদান করা হয়।
৫.স্ট্যাটুস-এর ৭৭(১) এ অনুচ্ছেদে ক্ষেত্রমত সর্বাধিক ৩০ বছরের জেল এবং বি অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ক্ষেত্রমত যাবজ্জীবন শাস্তির বিধান করা হয়। স্ট্যাটুস-এ গণহত্যার মত অপরাধের জন্যেও মৃত্যুদন্ডের বিধান রাখা হয়নি।
৬. স্ট্যাটুস-এর ৮২ অনুচ্ছেদে রায় ব্যতীত অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, আদেশের বিরুদ্ধে অভিযুক্তকে আপীলের অধিকার প্রদান করা হয়।
৭. স্ট্যাটুস-এর ২৫ এবং ২৮ অনুচ্ছেদে যথাক্রমে ব্যাক্তিগত ফৌজদারি দায় (Individual criminal responsibility) এবং সামরিক-বেসামরিক শীর্ষ কর্মকর্তাদের দায়বদ্ধতাকে (Responsibility of commanders and other superiors) সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। কোন অপরাধ না করেও ঐ অপরাধ সংগঠনে মদদ দেয়া, উৎসাহিত করা, আদেশ দেয়া এবং উস্কানিদাতাদেরকেও ঐ অপরাধ ঘটলে বা ঘটার উপক্রম হলে বিচারের আওতায় আনা হয়েছে। পক্ষান্তরে ২৮ নং আর্টিকেলে সক্রিয় সামরিক কমান্ডারদের জ্ঞাতসারে তার অধীনস্ত কেউ আন্তর্জাতিক অপরাধ সংগঠন করলে বা কোন বেসামরিক নেতা বা নেত্রীর জ্ঞাতসারে তার অধীনস্ত কেউ আন্তর্জাতিক অপরাধ সংগঠিত করলে, তার দায়ভার শীর্ষ সামরিক কমান্ডার ও বেসামরিক নেতৃবৃন্দের উপর সমভাবে আরোপ করার বিধান করা হয়েছে।
(পরবর্তী দফায় বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন ১৯৭৩ সম্বন্ধে আলোচনার ইচ্ছা রইল)


যুদ্ধের পরিণাম


BIBLIOGRAPHY

Bass, Gary Jonathan (2000). Stay the Hand of Vengeance. Princeton, N.J.: Princeton University Press.
Benton, Wilbour, and George Grimm, eds. (1955). German Views of the War Trials. Dallas, Tex.: Southern Methodist University Press.
Best, Geoffrey (1994). War and Law Since 1945. New York: Oxford University Press.
Bosch, William J. (1970). Judgment on Nuremberg. Chapel Hill, N.C.: University of North Carolina Press.
Calvocoressi, Peter (1948). Nuremberg. New York: Macmillan.
Conot, Robert E. (1983). Justice at Nuremberg. New York: Harper & Row.
Cooper, Belinda, ed. (1999). War Crimes: The Legacy of Nuremberg. New York: TV Books.
Gerhart, Eugene C. (1958). Robert H. Jackson, America's Advocate. New York: Bobbs-Merrill.
Harris, Whitney R. (1999). Tyranny on Trial, Revised edition. Dallas, Tex: Southern Methodist University Press.
International Military Tribunal (1947). Trial of the Major War Criminals. 42 volumes Nuremberg, Germany.
Jackson, Robert H. (1947). The Nürnberg Case. New York: Alfred A. Knopf.
Maser, Werner (1977). Nuremberg: A Nation on Trial. New York: Charles Scribner's Sons.
Neave. Airey (1978). On Trial at Nuremberg. Boston: Little, Brown.
Sands, Philippe, ed. (2003). From Nuremberg to The Hague. Cambridge: Cambridge University Press.
Smith, Bradley F. (1982). Reaching Judgment at Nuremberg. New York: Basic Books.
Stimson, Henry L., and McGeorge Bundy (1947) On Active Service in Peace and War. New York: Harper & Brothers.
Taylor, Telford (1949). Final Report to the Secretary of the Army. Washington, D.C.: U.S. Government Printing Office.
Taylor, Telford (1949). Nuremberg Trials: War Crimes and International Law. New York: Carnegie Endowment for International Peace.
Taylor, Telford (1992). The Anatomy of the Nuremberg Trials. New York: Alfred A. Knopf.
Thompson, H. K., Jr., and Henry Strutz, eds. (1976). Doenitz at Nuremberg: A Reappraisal. New York: Amber Publishing.
Tusa, Ann, and John (1983). The Nuremberg Trial. New York: Atheneum.
Zawodny, J. K. (1962). Death in the Forest: The Story of the Katyn Forest Massacre. Notre Dame, Ind.: University of Notre Dame Press.




Friday, March 1, 2013

Hibernation and Resurrection of International Crimes (Tribunals) Act, 1973

আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনাল) আইন, ১৯৭৩ এর শীতনিদ্রা ও পুনরুত্থান

  শীতনিদ্রা

১৯৭৩ সালের জুলাই মাসে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনাল)  আইন,  ১৯৭৩ প্রণয়ন করার পর ১৯৭৪ সালের ত্রিপক্ষীয় চুক্তি মোতাবেক পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দীদের মধ্যে যুদ্ধপরাধের অভিযোগে আটক ১৯৫ জন পাকিস্তানিকে মুক্তি দেয়ার পর এই আইন নিয়ে সকল কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়। এ আ্ইন প্রণয়নের পর শেখ মুজিবুর রহমান ক্ষমতায় ছিলেন আরো প্রায় ১১ মাস। কিন্তু  এ সময়ের মধ্যে ‌তার সরকার এ আইনে কারো বিচারের জন্যে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি। এ আইন প্রণীত হয়েছিল প্রধানত: পাকিস্তানি যুদ্ধপরাধীদের বিচারের উদ্দেশ্যে। তারা মুক্ত হয়ে যাওয়ায় কেউ আর এ আইনটি কার্যকর করার বিষয় মনে রাখেনি বা প্রয়োজন অনুভব করেনি। বিশেষত: পাকিস্তানি যুদ্ধপরাধীদের বিচারের জন্যে প্রণীত আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনাল) আইন ১৯৭৩ প্রণয়নের আগে, দেশীয় পাকিস্তানি সমর্থকদের ফৌজদারি অপরাধের জন্যে প্রণীত হয় দালাল আইন বা Bangladesh Collaborators (Special Tribunals) Order 1972 (President Order No VIII of 1972)। এ আইনে দেশিয় দালালদের মধ্যে অনেকেই গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমান দালালদের প্রতি শর্তাধীন সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করায়, যাদের প্রতি সুনির্দিষ্ঠ অভিযোগ আনীত হয়নি, এমন অনেকেই কারাগার থেকে মুক্তিলাভ করেন। দালাল আইনের বিচার প্রক্রিয়া ছিল প্রচলিত বিচার পদ্ধতি। এই আইনে কাদের বিচার করা হবে, তাদের বিরুদ্ধে কি অভিযোগ আনা হবে, কারা মামলা পরিচালনা করবে, সে সম্বন্ধে কোন বিশেষ ব্যবস্থা ছিল না। ফলে দালাল আইন দেশে এক বিশৃংখল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। সাধারণ ক্ষমা ঘোষণায় বিশৃংখল পরিস্থিতির অবসান হলেও, এর সুযোগ গ্রহণ করে খুন, ধর্ষণ ইত্যাদি নারকিয় অভিযোগে অভিযুক্ত পাকিস্তানি দালালরা। যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ঠ অভিযোগ ছিল, সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার মধ্য দিয়ে সেই সব মামলার বাদী, স্বাক্ষীরা নিরুৎসাহিত বোধ করে। দালালদের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী যে ঘৃণা ও ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছিল, ক্ষমা ঘোষণায় সেটা হতাশায় পর্যবেশিত হয়। এই সুযোগে মারাত্মক অপরাধ করেও অনেক দালাল ছাড়া পেয়ে যায় আইনের ফাঁক-ফোকরে। এভাবে  সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার মধ্য দিয়ে দালালদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের তৎপরতা স্তিমিত হয়ে যায়। ফলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাথে যেসব দালাল সক্রিয় সহযোগীতার মাধ্যমে হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুন্ঠনসহ মারাত্মক অপরাধ সংগঠিত করেছিল, তারাদের অধিকাংশই রেহাই পেয়ে যায় বিচারের হাত থেকে। ১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর তদানিন্তন রাস্ট্রপতি আবু মোহাম্মদ সায়েম বাংলাদেশ কলাররেটরস (ট্রাইবুনালস) (রিপিল) অর্ডিন্যান্স ১৯৭৫ (Bangladesh Collaborators (Special Tribunals) (Repeal) Ordinance, 1975) জারি করে দালাল আইন রহিত করলে, আটক, পলাতক ও মুক্ত সব ধরণের দালালের বিচার রহিত হয়ে যায়। ১৯৭৯ সালের ৬ এপ্রিল জাতীয় সংসদে সংবিধানের ৫ম সংশোধনী পাশ হলে, এ অর্ডিন্যান্স আইনের রূপ লাভ করে। এরপর পাকিস্তানি দালালদের বিচারের বিষয় পতিত হয়এক দীর্ঘ শীতনিদ্রায়।
বিচারপতি আবু মো: সায়েম

 

 হিসাব নিকাশ

পাকিস্তানের সহযোগীদের মধ্যে বাংলাদেশের  নাগরিকদের জন্যে প্রণীত দালাল আইন বিলুপ্তির মাধ্যমে তাদের জঘন্য কার্যের বিচার বন্ধ হলেও, দালালদের নিষ্ঠুরতার শিকার পরিবারের লোকজন তা মেনে নিতে পারেনি, পারেনি দেশের লেখক, কবি, সাংবাদিকসহ সুশীল সমাজের বহু সচেতন মানুষ। পাকিস্তান বাহিনীর নৃশংসতা,  পাক-বাহিনীর এদেশিয় দোসরদের বিশ্বাসঘাতকতা, বুদ্ধিজীবি হত্যায় জামায়াতে ইসলামী দলের আল-বদর, আল-শামস ইত্যাদি বাহিনীর প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা নিয়ে শুরু হয় প্রচুর গবেষণা। এসব গবেষণায় উঠে আসে রাজাকার, আল-বদর, আল-শামসদের নিজ দেশবাসির উপর শিহরণ জাগানো বর্বর নিষ্ঠুরতার বিবরণ। পাকিস্তানের সহযোগীদের ভিন্ন ভিন্ন নাম যথা: শান্তিবাহিনীর সদস্য, আল-শামসের সদস্য ইত্যাদি থাকলেও সবাইকে ঢালাওভাবে রাজাকার বলে উল্লেখ করা হতে থাকে। উল্লেখ্য আনসার বাহিনী মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিলে, আনসারদের পরিবর্তে গেজেট দ্বারা সরকারিভাবে রাজাকার নামে একটি বাহিনী গঠন করা হয়। রাজাকার শব্দটির সাথে দেশবাসির ঘৃণা যু্ক্ত হয় পাকিস্তানীদের সহযোগী হয়ে দেশবাসির উপর নির্মম নিষ্ঠুর অত্যাচার চালানোর জন্যে। বেগম সুফিয়া কামাল, শওকত ওসমান, নীলিমা ইব্রাহিম, গাজীউল হক, রাবেয়া খাতুন, সেলিনা হোসেন, জুবায়দা গুলশান আরা, আব্দুর রৌফ চৌধুরী, সৈয়দ শামসুল হক, আব্দুল্লা আল মামুন, রশীদ হায়দার, মুনতাসীর মামুন, মমতাজ উদ্দিনসহ দেশের বহু জ্ঞানীগুণীজন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অগণিত বই রচনা করেন। এসব বইয়ে বর্ণিত মুক্তিযুদ্ধের গৌরব এবং বিরোধীদের স্বদেশের সাথে বেঈমানি, স্বদেশের লোকজনের উপর নির্মম অত্যাচার উৎপীড়ণের বর্ণনায় দেশীয় দালালদের প্রতি তীব্র ঘৃণায় বিষিয়ে ক্রমাগত বিষিয়ে তুলে তরুণদের মন। পক্ষান্তরে মুক্তিযোদ্ধারা বীর হিসেবে স্থান লাভ করেন মানুষের মনে। সরকারি উদ্যোগে হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ১৬ খন্ডে ১৯৮২-৮৩ সালে প্রকাশিত হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্র। মুক্তিযুদ্ধকে উপলব্ধী করতে এ বইটি বিরাট ভূমিকা পালন করে। কারণ এর মধ্য দিয়ে মানুষ মুক্তিযুদ্ধের গতিপ্রকৃতি এবং পাকিস্তানিদের দোসর জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ ইত্যাদির দলের ন্যাক্কর জনক ভূমিকা পুনরাবিস্কার করে। এভাবে শীতনিদ্রার মধ্যে যুদ্ধপরাধের দায়ে বাংলাদেশের দালালদের বিচারের দাবি ক্রমেই শক্তিলাভ করতে থাকে মানুষ বিশেষত তরুণ প্রজন্মের মনে। অপরদিকে মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলাম দল পাকিস্তানের দালালি করলেও, এরা প্রায় নি:শেষ হয়ে যায় রাজনৈতিক দল হিসেবে। উত্থান ঘটতে থাকে ইসলাম ধর্ম ভিত্তিক জামায়াতে ইসলাম দলের, যাদের কর্মীরা মুক্তিযুদ্ধের সময় আল-বদর, আল-শামস হিসেবে বুদ্ধিজীবি হত্যার সাথে জড়িত ছিল বলে ব্যাপকভাবে সমালোচিত ছিল। এদের উত্থান উদীয়মান অসাম্প্রদায়িক তরুণ ও বুদ্ধিজীবি সমাজ সহজভাবে গ্রহণ করেনি। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-এর প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান (১৯৭৭-১৯৮১) জাতিকে রাজনৈতিক দ্বিধাবিভক্তি থেকে মুক্ত করে ঐক্যের রাজনীতি চালুর প্রয়াসে ১৯৭৮ সালে জামায়াতে ইসলামীর উপর থেকে রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে, আসম্প্রদায়িক লোকজনের কাছে তা ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি একটি প্রতারণা মাত্র। ফলে প্রেসিডেন্ট জিয়ার ঐক্য প্রয়াস সফল হয়নি। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে অসাম্প্রদায়িক চেতনা পোষণকারিদের মধ্যে আশা ছিল আওয়ামী লীগ জয় লাভ করবে নির্বাচনে। কিন্তু তাদের আশায় ছাই দিয়ে জয় লাভ করল বিএনপি। আশাহত এসব লোকজন যুদ্ধপরাধী হিসেবে জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য দলের লোকজনের বিচারের দাবিতে জনমত গঠন করে চলছিল দেশব্যাপী। এর মধ্যে পাকিস্তানের পাসপোর্টে বাংলাদেশে ফেরত আসা পাকিস্তান বাহিনীর অন্যতম সহযোগী গোলাম আযমকে ১৯৯১ সালের ২৯ ডিসেম্বর জামায়াতে ইসলামী দলের আমীর নির্বাচন করলে তা আগুণে ঘৃতাহুতি প্রদান করে। এই পটভূমিতে যুদ্ধপরাধীর বিচার ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে একাত্তরের যুদ্ধের অন্যতম শহীদমাতা জাহানারা ইমামকে
জাহানারা ইমাম

আহ্বায়ক করে কবি সুফিয়া কামাল, জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী, লে.কর্নেল (অব:) কাজী নুরুজ্জামান, বিচারপতি কে এম সোবহান প্রমুখ ১০১ জন গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তির সমন্বয়ে গঠিত হয় একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। এর পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী প্রতিরোধ মঞ্চ, ১৪টি ছাত্র সংগঠন, প্রধান প্রধান রাজনৈতিক জোট, শ্রমিক-কৃষক-নারী এবং সাংস্কৃতিক জোটসহ ৭০টি সংগঠনের সমন্বয়ে পরবর্তীতে ১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৯২ ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি’ গঠিত হয়। সর্বসম্মতিক্রমে এর আহ্বায়ক নির্বাচিত হন জাহানারা ইমাম। এই কমিটি ১৯৯২ সালে ২৬ মার্চ ’গণআদালত’ এর মাধ্যমে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একাত্তরে পাকিস্তানিদের বিশ্বস্ত সহচর, বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রবল বিরোধীতাকারি গোলাম আযমের ঐতিহাসিক বিচার অনুষ্ঠান করে। গণআদালাতে গোলাম আযমের বিরুদ্ধে ১০টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উত্থাপিত হয়। ১২ জন বিচারক সমন্বয়ে গঠিত গণআদালতের চেয়ারম্যান জাহানারা ইমাম গোলাম আযমের ১০টি অপরাধ মৃত্যুদন্ডযোগ্য বলে ঘোষণা করেন। এই গণআদালতের সদস্য ছিলেনঃ এডভোকেট গাজিউল হক, ডঃ আহমদ শরীফ, মাজহারুল ইসলাম (স্থপতি), ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ (বর্তমান আইন মন্ত্রী), সুফিয়া কামাল, কবীর চৌধুরী, কলিম শরাফী, শওকত ওসমান, লেঃ কর্ণেল (অবঃ) কাজী নুরুজ্জামান, লেঃ কর্ণেল (অবঃ) আবু ওসমান চৌধুরী এবং ব্যারিস্টার শওকত আলী খান।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এমনকি বিদেশেও গঠিত হয় নির্মূল কমিটি এবং শুরু হয় ব্যাপক আন্দোলন। পত্র-পত্রিকায় সংবাদ শিরোনাম হয়ে উঠলে আন্তর্জাতিক মহলেও ব্যাপক পরিচিতি অর্জন করেন জাহানারা ইমাম। গোলাম আযমসহ একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবির আন্দোলনকে সমর্থন দেয় ইউরোপীয় পার্লামেন্ট। আন্দোলন ব্যাপকতা লাভ করে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে। ২৬ মার্চ ১৯৯৩ সালে স্বাধীনতা দিবসে গণআদালত বার্ষিকীতে জাহানারা ইমামের নেত্রত্বে গণতদন্ত কমিটি ঘোষিত হয় এবং আরো আটজন যুদ্ধাপরাধীর নাম ঘোষণা করা হয়। এই ঘৃণ্য আটজন যুদ্ধাপরাধীর নামঃ আব্বাস আলী খান, মতিউর রহমান নিজামী, মোঃ কামরুজ্জামান, আবদুল আলীম, দেলোয়ার হোসেন সাঈদী, মওলানা আবদুল মান্নান, আনোয়ার জাহিদ এবং আবদুল কাদের মোল্লা। ২৬ মার্চ ১৯৯৪ সালে স্বাধীনতা দিবসে গণআদালতের ২য় বার্ষিকীতে গণতদন্ত কমিশনের চেয়ারম্যান কবি বেগম সুফিয়া কামাল ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের সামনে রাজপথের বিশাল জনসমাবেশে জাহানারা ইমামের হাতে জাতীয় গণতদন্ত কমিশনের রিপোর্ট হস্তান্তর করেন। গণতদন্ত কমিশনের সদস্যরা হচ্ছেনঃ শওকত ওসমান, কে এম সোবহান, সালাহ উদ্দিন ইউসুফ, অনুপম সেন, দেবেশ চন্দ্র ভট্টাচার্য, খান সারওয়ার মুরশিদ, শামসুর রাহমান, শফিক আহমেদ, আবদুল খালেক এবং সদরুদ্দিন। এই সমাবেশে আরো আটজন যুদ্ধাপরাধীর বিরুদ্ধে তদন্ত অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেয়া হয় (উইকিপিডিয়া থেকে সংগৃহীত তথ্য মোতাবেক।)।
একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির পাশাপাশি গত দুই দশকে বিভিন্ন গবেষক, সংস্থা, মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের হাতে পাইকারি হত্যা, খুন, ধর্ষন, লুন্ঠন, অগ্নিসংযোগ, ধর্মান্তরকরণ ইত্যাদি অপরাধের প্রত্যক্ষদর্শী স্বাক্ষীদের জবানবন্দী প্রকাশ করেন, মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডারসহ সশস্ত্র বাহিনীর উর্ধতন কর্মকর্তাগণও প্রকাশ করেন মুক্তিযুদ্ধের সময়কার বাঙালি জাতির গৌরবজনক ভূমিকা ও প্রতিপক্ষের নিষ্ঠুর নির্যাতনের ভয়াবহ বিবরণ। সেই সাথে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন সেক্টরের অধিনায়কগণ তাদের সংগঠন সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম যুদ্ধপরাধের বিচারে সোচ্চার হয়ে দেশব্যাপী প্রচারণা চালায়। এর মধ্যে ১৯৯৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বুদ্ধিজীবি হত্যার অন্যতম সন্দেহভাজন চৌধুরী মঈনুদ্দীন, আশরাফুজ্জামান এবং অন্যান্যের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর অধ্যাপক গিয়াস উদ্দিনকে হত্যার দায়ে মামলা দায়ের করেন তাঁর বোন ফরিদা বানু। মাগুরাতেও খাদেজা নামে এক নারী ১০ জন দালালের বিরুদ্ধে তাঁর ভাই মুক্তিযোদ্ধা হাশেম মোল্লাকে হত্যার জন্যে খুনের মামলা দায়ের করেন। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এলে তারা সরকার গঠন করে ৪ দলকে নিয়ে যার বড় অংশীদার ছিল জামায়াতে ইসলাম। এসময় জামায়াতে ইসলামের মওলানা নিজামী এবং মুজাহিদ মন্ত্রীত্ব লাভ করলে তা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকদের জন্যে বয়ে আনে বেদনাদায়ক অপমান। কারণ এ দুজনই ছিল পাকিস্তানের অনুগত এবং বাংলাদেশ বিরোধী। এছাড়াও এদের বিপক্ষে ছিল পাকিস্তান রক্ষায় মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের অনুসারীদের খতমের জন্যে গঠিত আল-শামস, আল-বদর নামে সশস্ত্র বাহিনী গঠন, নেতৃত্বদান এবং পাইকারি হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে তাদের সক্রিয় অংশ গ্রহণের অভিযোগ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী এই দুজন গুরুত্বপূর্ণ লোক মন্ত্রী হয়ে গাড়ী ও তাদের বাড়ীতে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কারো পক্ষে সহ্য করা সম্ভব ছিল না।

পুনরুত্থান

এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধপরাধের বিচারের প্রশ্নে জাতির তরুণ প্রজন্ম সাহিত্যিক, সাংবাদিক, গবেষক, কবি, নাট্যকার, সেক্টর কমান্ডার, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির দ্বারা বিপুলভাবে প্রভাবিত হয়ে সোচ্চার হয়ে উঠে। ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে অন্যান্য প্রতিশ্রুতিসহ ১৯৭১ সালের যুদ্ধপরাধীদের বিচার করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিপুলভাবে জয়ী হয় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত মহাজোট। পক্ষান্তরে বিএনপি-এর নেতৃত্বাধীন ৪ দলীয় ঐক্যজোট এ নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয় বরণ করে। অনেকে মনে করেন নির্বাচনের ফলাফলের অন্যতম নির্ণায়ক ছিল যুদ্ধপরাধীদের দাবির প্রশ্ন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রত্যক্ষ বিরোধীতা করেছিল জামায়াতে ইসলাম। এছাড়া এ দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে ছিল পাকিস্তানিদের দোসর হয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংগঠনের অভিযোগ। বিএনপি আগের মেয়াদে ৫ বছর ক্ষমতায় থাকার সময় জামায়াতে ইসলামী দলের দুজন নেতাকে মন্ত্রী বানিয়েছিল, যারা ছিল জনগণের চোখে ৭১-এর যুদ্ধপরাধী। এরা মন্ত্রী হওয়ার সূযোগে গাড়ি ও বাড়িতে বাংলাদেশের পতাকা ওড়ায়, যা ছিল মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের লোকদের নিকট অসহনীয় অপমানের শামিল। তরুণ প্রজন্ম নির্বাচনের সময় প্রত্যাখ্যান করে জামায়াতে ইসলামীকে। বিএনপিও জামায়াতের অংশীদার হিসেবে এর প্রতিফল ভোগ করে।
আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর তার নির্বাচনী এজেন্ডা বাস্তবায়নের পথে যুদ্ধপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ গ্রহণ করে। তবে বিতর্কিত ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরকারের প্রত্যক্ষ উদ্যোগ পরিহার করে, পরোক্ষভাবে নিজ উদ্দেশ্য হাসিলের নীতি অনুসরণে দক্ষ আওয়ামী লীগ যুদ্ধপরাধের বিচারের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটায়নি। যুদ্ধপরাধের বিচারের জন্যে সরকার থেকে কোন প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়নি সংসদে। পরিবর্তে  ২০০৯ সালের ২৯ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে যুদ্ধপরাধীদের বিচারের প্রস্তাব উত্থাপন করেন সিলেট-৩ আসন থেকে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের এমপি মাহমুদুস সামাদ চৌধুরী। বিরোধী দলের সংসদ বর্জনের কারণে মন্ত্রী ব্যতীত একজন সাংসদের আনীত প্রস্তাব নজীরবিহিনভাবে অতিদ্রুতায় সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয় জাতীয় সংসদে জানুয়ারি মাসের ২৯ তারিখে  (দেখুন ডেইলি স্টার, ৩০ জানুয়ারি ২০০৯) । এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৯ সালের মার্চের ২৫ তারিখে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক আন্ত-মন্ত্রণালয় বৈঠকে সরকার সিদ্ধান্ত নেয় যে যুদ্ধপরাধীদের বিচার হবে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনাল) আইন,১৯৭৩-এর অধীনে এবং বিচারের জন্যে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা হবে হালনাগাদ করার জন্যে (ডেইলি স্টার ২৬ মার্চ ২০০৯)। অত:পর সংশোধনী আনয়নের জন্যে বিষয়টি ২০০৯ সালের ২১ মে তারিখে প্রেরিত হয় আইন কমিশিনে। আইন কমিশন আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনাল) আইন, ১৯৭৩-এ কি কি সংশোধণী আনা যায়, সে সম্পর্কে দেশের খ্যাতনামা ৩৩ জন আইনবিদ ও আইন বিজ্ঞানীর নিকট মতামত চেয়ে অনুরোধ করে। যাদেরকে মতামত দেবার জন্যে অনুরোধ করা হয়, তারা হলেন, জাস্টিস কামাল উদ্দীন হোসেন, জাস্টিস এ.টি.এম, আফজাল, জাস্টিস মুহম্মদ হাবিবুর রহমান, জাস্টিস মোস্তফা কামাল, জাস্টিস মুহম্মদ গোলাম রব্বানী, জাস্টিস এবাদুল হক, ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ কুষ্টিয়ার ইসলামী ইউনিভারসিটি, ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের প্রধানবৃন্দ, সুপ্রীম কোর্ট বারের সভাপতি ও সেক্রেটারি, ঢাকা বারের সভাপতি ও সেক্রেটারি, মুহম্মদ ওয়ালীউর রহমান, মুহম্মদ টি এইচ খান, রফিকুল হক, ড. এম জহির, খন্দকার মাহবুব উদ্দিন আহমদ, ড. কামাল হোসেন, এম আমীরুল ইসলাম, মাহমুদুল ইসলাম, রুকনউ্দ্দিন মাহমুদ, আব্দুল বাছেত মজুমদার, আজমালুল হুসেইন, মঈনুল হোসেন, আকতার ইমাম, শেখ রাজ্জাক আলী, আব্দুর রাজ্জাক, তওফিক নেওয়াজ, আব্দুল রাজ্জাক খান এবং খান সাইফুর রহমান। এদের মধ্যে কেবল বিচারপতি কাজী এবাদুল হক এবং ড. আব্দুল্লা আল ফারুকের মতামত নিয়ে আইন কমিশনের ৩ জন সদস্য (চেয়ারম্যানসহ) আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনাল) আইন, ১৯৭৩-এর সংশোধনী সম্বলিত প্রতিবেদন দাখিল করেন সরকারের নিকট। এতবড় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অন্যদের কাছ থেকে কেন সংশোধনী প্রস্তাব পাওয়া গেল না, বা কেন তারা দেননি, তাদের মতামত পাওয়ার জন্যে কি ধরণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল, সে বর্ননা তাঁদের প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই। এটা এ জন্যে উল্লেখ করা হলো যে, অনেকের ধারণা সংশোধনী প্রস্তাবটি দেশের বরেন্য আইনবিদদের দ্বারা পরীক্ষিত হয়ে বর্তমান রূপ লাভ করেছে। যেমন উইকিপিডিয়ায় উল্লেখ করা হয়েছে, "As a part of the amendment procedure the government sent the act to the Law Commission where it was scrutinised by specialist lawyers, judges and professors of the universities

এখানে একটা প্রশ্ন ওঠে। সেটা হলো দেশের বরেণ্য ব্যাক্তিগণও কেন স্বউদ্যোগে এ বিষয়ে মুখ না খুলে নীরব রইলেন । যে আইনটি প্রণীত হয়েছিল আত্মসমর্পনকারি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর যেসব সদস্য যুদ্ধপরাধের সাথে জড়িত ছিল তাদের বিচারের জন্যে, যে আইনটি পাকিস্তানি যুদ্ধপরাধীদের ক্ষমার মধ্য দিয়ে  শেখ মুজিবের আমলব্যাপী আকার্যকর থেকে যায় এবং হিমাগারে পড়ে থাকে ৩৬/৩৭ বছর, সে আইনে পাকিস্তানিদের বাঙালি দোসদের বিচার কতটুকু সঙ্গত ছিল এ বিষয়ে শুরুতেই কনসেনসাস জরুরি ছিল। সরকার তার রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও উদ্দেশ্য পুরণের জন্যে যে সহজ পথ বেছে নেবে, তাতে সন্দেহ নেই। তারপরও নিয়ম রক্ষার খাতিরে হোক বা আন্তরিকভাবেই হোক, আইন কমিশন দেশের বরেণ্য আইনবিদদেরকে পাকিস্তান সমর্থনকারি বাঙালিদের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের বিষয়ে মতামত জানানোর অনুরোধ জানিয়েছে। তা সত্বেও এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বরেণ্য আইনজীবিদের নীরবতার অর্থ আর কি হতে পারে?  বিশ্বের কোথাও নিজ নাগরিকদের যুদ্ধপরাধের জন্যে দেশীয় আইনে বিচারের উদ্যোগ নজীরবিহীন। তাই বলে তারা বিচারের উর্ধে থাকতে পারেনা। ৭১ সালে পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে বাঙালি জাতির স্বাধীনতার আকাঙ্খার বিপরীতে থেকে যারা নৃশংস কর্মকান্ডে অংশ নিয়েছে বা মদদ দিয়েছে, তাদের বিচারের মাধ্যমে উপযুক্ত দন্ডদানের প্রশ্নে কোন দ্বিমত থাকতে পারেনা। তবে যদি অতীতে তাদের কোন না কোন ভাবে ক্ষমা করা হয়ে থাকে, তাহলে সেটাও খোলাসা করা বরেণ্য আইনজীবিদের নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। এ বিষেয় তাদেঁর নীরবতা কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না। দেশব্যাপী যখন দেশীয় পাকিস্তানি দালালদের অপরাধের বিচারের জন্যে দাবি উঠছে, তখন ঐ দাবীর যথার্থতার প্রশ্নে মতামত দেয়া অথবা দাবির প্রেক্ষিতে কি ব্যবস্থা নেয়া যায়, সে বিষয়ে দিক নির্দেশনা দেয়া দেশের খ্যাতিমান আইনবিদদের অবশ্য কর্তব্য। তারা অনুরাগ বিরাগের উর্ধে ওঠে জাতির একটি ক্রান্তি লগ্নে বিবেক অনুযায়ী পরামর্শ দিলে, সহজ হয়ে যেতো আজকের  অনেক বিতর্কিত বিষয়। বিজ্ঞ আইনজীবি ও আইন বিজ্ঞানিদের দ্বারা যে কয়টি বিষয়ে মতামত জরুরি ছিল, সেগুলো আমার বিবেচনায় নিম্নরূপ:
১. ত্রিপক্ষীয় চু্ক্তি অনুযায়ী উপমহাদেশে শান্তি ও সৌহার্দ স্থাপনের জন্যে পাকিস্তানি যুদ্ধপরাধীদের ক্ষমা করে দেয়ার পর, তাদের বাঙালি দোসরদের বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনাল) আইন, ১৯৭৩ অনুযায়ী কতটুকু যুক্তিযুক্ত ছিল।
২. বাংলাদেশ কলাবরেটর (বিশেষ ট্রাইবুনাল) অর্ডার ১৯৭২ জারি করা হয়েছিল বাঙালিদের মধ্যে যারা হত্যা, ধর্ষন ইত্যাদি অপরাধে যুক্ত ছিল তাদের বিচারের জন্যে। ১৯৭৫ সালে বিলুপ্ত এ আইনটি পুনরুজ্জীবন করে ১৯৭১ সালে যেসব বাঙালি পাকিস্তানিদের সহযোগী হয়ে নৃশংস কর্মকান্ডে জড়িত ছিল তাদের বিচার করা নৈতিক ও আইনি দিক থেকে যৌক্তিক ছিল কি না।
৩. আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনাল) আইন, ১৯৭৩ অনুযায়ী বিচার করতে গেলেও যেখানে সংশোধনীর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছে সরকার, সেখানেও বরেণ্য আইনবিদবৃন্দ ন্যায় বিচার নিশ্চিত করতে আইনের কি কি পরিবর্তন দরকার, সে সম্বন্ধে মূল্যবান সুপারিশ রাখার অবাধ সূযোগ ছিল। বিশেষত: নূরেনবার্গ ট্রায়ালের পর যুদ্ধপরাধ আইন ক্রমবিবর্তনের মধ্য দিয়ে একটি আন্তর্জাতিক রূপ লাভ করেছিল রোম স্ট্যাটুসের দ্বারা। ফলে দেশিয় যুদ্ধপরাধের আইনের সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গতি সাধন করার জন্যে কি কি পরিবর্তন আনা প্রয়োজন সে সম্পর্কে আলোক পাত করা। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রণীত যুদ্ধপরাধের আইনটির আন্তর্জাতিক মান রক্ষা ও বিচারের স্বচ্ছতার জন্যে কী করণীয় তা জনগণও জানার সূযোগ লাভ করতো।
 কিন্তু তারা এ দায়িত্ব পালন করেন নি। ফলে সরকার একাই তার রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সহজ পথ হিসেবে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনাল) আইন, ১৯৭৩ নিজেদের সুবিধামতো সংশোধনের পথ বেছে নেয়।  সেমতে, আইন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনাল) আ্‌ইন, ১৯৭৩-এর সংশোধনের লক্ষে জাতীয় সংসদে  আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনালস) (সংশোধনী) আইন, ২০০৯ (২০০৯ সালের ৫৫ নং আইন) উত্থাপিত হয় ২০০৯ সালের ৮ জুলাই বুধবার। ঐদিনই আইনটি প্রেরিত হয় আইন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিতে। কমিটি বৃহস্পতিবার সকালের মধ্যে বাছাই সমাপ্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করে এবং রাতের অধিবেশনে বিরোধী দলের অনুপস্থিতে সর্বসম্মতিক্রমে পাশ হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনালস) (সংশোধনী) আইন, ২০০৯ (ডেইলি স্টার ১০ জুলাই ২০০৯)।
 এখানে বিরোধী দলের দায়িত্বহীনতার প্রশ্নও আলোচনার দাবি রাখে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার স্বপক্ষ ও বিপক্ষের শক্তি একাকার করে দেশ গঠনের জন্যে চেয়েছিলেন একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠনের। তিনি চেয়েছিলেন জাতি অতীতের তিক্ততা ভুলে গিয়ে এক হয়ে শরীক হোক দেশের উন্নয়ন কর্মকান্ডে। প্রেসিডেন্ট সায়েমের কথা যতই বলা হোক না কেন Bangladesh Collaborators (Special Tribunals) (Repeal) Ordinance, 1975- আইনে পরিণত করার জন্যে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা অনস্বীকার্য। মু্ক্তিযুদ্ধের সরাসরি বিরোধীতা করেছেন, পাকিস্তানি সৈন্যদের নৃশংসতার সাথে জড়িত ছিলেন, এমন লোকদেরও তিনি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে স্থান দিয়েছেলেন। এজন্যে তিনি প্রবলভাবে সমালোচিত হয়েছেন বিরোধীদের দ্বারা। কিন্তু যখন সময় এলো জিয়ার অনুসিৃত নীতির পক্ষে শক্তভাবে দাড়ানোর, তখন বিএনপি-র নীরবতার সকল সুযোগ নিল তাদের চির প্রতিদ্বন্দ্বি আওয়ামী লীগ। এমনকী বিএনপি-র সাধারণ সম্পাদক এই বলে মন্তব্য করলেন যে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার স্বচ্ছ হলে বিএনপির আপত্তি নেই
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার স্বচ্ছ হলে বিএনপির আপত্তি নেই
আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনালস) (সংশোধনী) আইন, ২০০৯ পাশ হয়ে গেলো কোন প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই। ২০১০ সালের ২৫ মার্চ আইন মন্ত্রী এক সাংবাদিক সন্মেলেন জানান যে ১৯৭১ সালে যেসব বাঙালি মানবতাবিরোধী অপরাধের সাথ জড়িত ছিল তাদের বিচার হবে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনাল) আইন, ১৯৭৩-এর অধীনে। তিনি আরো জানান যে, সংশোধিত আইনের আওতায় হাইকোর্টের বিচারপতি মুহম্মদ নিজামুল হককে চেয়ারম্যান করে এবং বিচারপতি এ.টি.এম ফজলে কবীর ও অবসর প্রাপ্ত জেলা জজ এ,কে,এম জাহির আহমেদকে নিয়ে গঠিত হলো মানবতাবিরোধী অপরাধে দেশের নিজ নাগরিকদের বিচারের জন্যে ট্রাইবুনাল গঠিত হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) অ্যাক্টের ৬ ধারার ক্ষমতাবলে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ করে। এর আগে সকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর সচিবালয়ের দপ্তরে ট্রাইব্যুনাল, তদন্ত সংস্থা ও আইনজীবী প্যানেলের নাম অনুমোদন করেন। রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান দুপুরে ট্রাইব্যুনালের নাম অনুমোদন করেন। রাতেই তা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। আইনজীবী প্যানেল: ১২ সদস্যের আইনজীবী প্যানেলের প্রধান (চিফ প্রসিকিউটর) করা হয়েছে গোলাম আরিফকে। অন্য সদস্যরা হচ্ছেন: সৈয়দ রেজাউর রহমান, গোলাম হাসনাইন, রানা দাশগুপ্ত, জহিরুল হক, নুরুল ইসলাম, সৈয়দ হায়দার আলী, খন্দকার আবদুল মান্নান, মোশারফ হোসেন, জিয়াদ-আল-মালুম, সানজিদা খানম ও সুলতান মাহমুদ।তদন্তকারী সংস্থা: সাবেক জেলা জজ ও আইন মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব আবদুল মতিনের সমন্বয়ে সাত সদস্যের তদন্তকারী সংস্থা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সংস্থার অন্য সদস্যরা হচ্ছেন: পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক আবদুর রহিম, সাবেক উপমহাপরিদর্শক কুতুবুর রহমান, মেজর (অব.) এ এস এম সামসুল আরেফিন, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক মীর শহীদুল ইসলাম, একই বিভাগের পরিদর্শক নুরুল ইসলাম ও আবদুর রাজ্জাক খান। সংবাদ সম্মেলনে আইনমন্ত্রী বলেন, গতকাল থেকেই ট্রাইব্যুনাল, আইনজীবী প্যানেল ও তদন্তকারী সংস্থার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তদন্তে যাদের নাম আসবে তারাই বিচারের সম্মুখীন হবে। তথ্য, সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহসহ আনুষঙ্গিক কাজে তদন্তে কিছু সময় লাগবে বলে জানান তিনি।(দেখুন প্রথম আলো ২৬ মার্চ ২০১০)। সরকারের এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করার সময় বিএনপি নীরবতা বজায় রাখার নীতিতে অবিচল থাকে এবং জামাতে ইসলামী জানায় যে, তারা অপেক্ষা ও দেখার নীতি গ্রহণ করেছে। (দেখুন : "Jamaat to wait, see" ডেইলি স্টার ১৬ মার্চ ২০১০)।



দিনপঞ্জি:
২৪ জানুয়ারি   ১৯৭২   : বাংলাদেশ কলাবরেটর (স্পেশাল ট্রাইবুনাল) আইন, ১৯৭২ জারি।
২০ জুলাই      ১৯৭৩   : আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনালস) আ্ইন, ১৯৭৩ প্রণয়ন
৩১ ডিসেম্বর   ১৯৭৫   : বাংলাদেশ দালাল (বিশেষ ট্রাইবুনালস) (রিপিল) অর্ডিন্যান্স, ১৯৭৫ জারি।
২৯ ডিসেম্বর   ১৯৯১   : গোলাম আযম জামায়াতে ইসলামীর আমীর নির্বাচিত
১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৯২   : ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি’                                       -এর আত্মপ্রকাশ।
২৬ মার্চ ১৯৯২         : 'গণ-আদালত" কর্তৃক গোলাম আযমকে ১০টি অভিযোগে মৃত্যুদন্ডযোগ্য বলে রায় ঘোষণা।     
২৯ ডিসেম্বর ২০০৮   : সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও তাদের জোট সাধারণ নির্বাচনে নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা
                            লাভ।
২৯ জানুয়ারি ২০০৯  : যুদ্ধপরাধীদের বিচারের জন্যে এম.পি. মাহমুদুস সামাদের প্রস্তাব উত্থাপন এবং সংসদের সমর্থন।
২৫ মার্চ ২০০৯        : স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আন্ত:মন্ত্রণালয় বৈঠকে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনালস) আইন, ১৯৭৩-এর
                            অধীনে যুদ্ধপরাধের বিচারের ও ঐ আইন যুগোপযোগী করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ।
২১ মে ২০০৯          : আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনালস) আইন, ১৯৭৩-এর সংশোধনী আনয়নের জন্যে আইন
                            কমিশনে প্রেরণ।
২৪ জুন ২০০৯        : আইন কমিশন কর্তৃক সরকারের নিকট আইনের সংশোধনীর সুপারিশ প্রণয়ন।
০৯ জুলাই ২০০৯    : সংসদে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনালস) (সংশোধনী) আইন, ২০০৯ পাশ।
১৪ জুলাই ২০০৯     : রাস্ট্রপতি কর্তৃক আইন অনুমোদন।
২৫ মার্চ ২০১০        : আইনমন্ত্রী কর্তৃক ট্রাইবুনাল, আইনজীবি প্যানেল ও তদন্ত দল গঠনের সংবাদ প্রকাশ।
                           

আইনমন্ত্রী জানান, আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) অ্যাক্টের ৬ ধারার ক্ষমতাবলে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ করে সরকার এই ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছে।
এর আগে সকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর সচিবালয়ের দপ্তরে ট্রাইব্যুনাল, তদন্ত সংস্থা ও আইনজীবী প্যানেলের নাম অনুমোদন করেন। রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান দুপুরে ট্রাইব্যুনালের নাম অনুমোদন করেন। রাতেই তা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়।
আইনজীবী প্যানেল: ১২ সদস্যের আইনজীবী প্যানেলের প্রধান (চিফ প্রসিকিউটর) করা হয়েছে গোলাম আরিফকে। অন্য সদস্যরা হচ্ছেন: সৈয়দ রেজাউর রহমান, গোলাম হাসনাইন, রানা দাশগুপ্ত, জহিরুল হক, নুরুল ইসলাম, সৈয়দ হায়দার আলী, খন্দকার আবদুল মান্নান, মোশারফ হোসেন, জিয়াদ-আল-মালুম, সানজিদা খানম ও সুলতান মাহমুদ।
তদন্তকারী সংস্থা: সাবেক জেলা জজ ও আইন মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব আবদুল মতিনের সমন্বয়ে সাত সদস্যের তদন্তকারী সংস্থা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সংস্থার অন্য সদস্যরা হচ্ছেন: পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক আবদুর রহিম, সাবেক উপমহাপরিদর্শক কুতুবুর রহমান, মেজর (অব.) এ এস এম সামসুল আরেফিন, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক মীর শহীদুল ইসলাম, একই বিভাগের পরিদর্শক নুরুল ইসলাম ও আবদুর রাজ্জাক খান।
সংবাদ সম্মেলনে আইনমন্ত্রী বলেন, গতকাল থেকেই ট্রাইব্যুনাল, আইনজীবী প্যানেল ও তদন্তকারী সংস্থার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তদন্তে যাদের নাম আসবে তারাই বিচারের সম্মুখীন হবে। তথ্য, সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহসহ আনুষঙ্গিক কাজে তদন্তে কিছু সময় লাগবে বলে জানান তিনি। - See more at: http://www.prothom-alo.com/detail/date/2010-03-26/news/51693#sthash.EnF6HilX.dpuf