আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনাল) আইন, ১৯৭৩ এর শীতনিদ্রা ও পুনরুত্থান
শীতনিদ্রা
১৯৭৩
সালের জুলাই মাসে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনাল) আইন, ১৯৭৩ প্রণয়ন করার
পর ১৯৭৪ সালের ত্রিপক্ষীয় চুক্তি মোতাবেক পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দীদের মধ্যে
যুদ্ধপরাধের অভিযোগে আটক ১৯৫ জন পাকিস্তানিকে মুক্তি দেয়ার পর এই আইন নিয়ে
সকল কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়। এ আ্ইন প্রণয়নের পর শেখ
মুজিবুর রহমান ক্ষমতায় ছিলেন আরো প্রায় ১১ মাস। কিন্তু এ সময়ের মধ্যে তার সরকার এ আইনে কারো
বিচারের জন্যে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি। এ আইন প্রণীত হয়েছিল প্রধানত:
পাকিস্তানি যুদ্ধপরাধীদের বিচারের উদ্দেশ্যে। তারা মুক্ত হয়ে যাওয়ায় কেউ আর
এ আইনটি কার্যকর করার বিষয় মনে রাখেনি বা প্রয়োজন অনুভব করেনি। বিশেষত: পাকিস্তানি যুদ্ধপরাধীদের বিচারের জন্যে প্রণীত আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনাল) আইন ১৯৭৩ প্রণয়নের আগে, দেশীয় পাকিস্তানি সমর্থকদের ফৌজদারি অপরাধের জন্যে প্রণীত হয় দালাল আইন বা Bangladesh Collaborators (Special Tribunals) Order 1972 (President Order No VIII of 1972)। এ আইনে দেশিয় দালালদের মধ্যে অনেকেই গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমান দালালদের প্রতি শর্তাধীন সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করায়, যাদের প্রতি সুনির্দিষ্ঠ অভিযোগ আনীত হয়নি, এমন অনেকেই কারাগার থেকে মুক্তিলাভ করেন। দালাল আইনের বিচার প্রক্রিয়া ছিল প্রচলিত বিচার পদ্ধতি। এই আইনে কাদের বিচার করা হবে, তাদের বিরুদ্ধে কি অভিযোগ আনা হবে, কারা মামলা পরিচালনা করবে, সে সম্বন্ধে কোন বিশেষ ব্যবস্থা ছিল না। ফলে দালাল আইন দেশে এক বিশৃংখল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। সাধারণ ক্ষমা ঘোষণায় বিশৃংখল পরিস্থিতির অবসান হলেও, এর সুযোগ গ্রহণ করে খুন, ধর্ষণ ইত্যাদি নারকিয় অভিযোগে অভিযুক্ত পাকিস্তানি দালালরা। যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ঠ অভিযোগ ছিল, সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার মধ্য দিয়ে সেই সব মামলার বাদী, স্বাক্ষীরা নিরুৎসাহিত বোধ করে। দালালদের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী যে ঘৃণা ও ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছিল, ক্ষমা ঘোষণায় সেটা হতাশায় পর্যবেশিত হয়। এই সুযোগে মারাত্মক অপরাধ করেও অনেক দালাল ছাড়া পেয়ে যায় আইনের ফাঁক-ফোকরে। এভাবে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার মধ্য দিয়ে দালালদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের তৎপরতা স্তিমিত হয়ে যায়। ফলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাথে যেসব দালাল সক্রিয় সহযোগীতার মাধ্যমে হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুন্ঠনসহ মারাত্মক অপরাধ সংগঠিত করেছিল, তারাদের অধিকাংশই রেহাই পেয়ে যায় বিচারের হাত থেকে। ১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর তদানিন্তন রাস্ট্রপতি আবু মোহাম্মদ সায়েম বাংলাদেশ কলাররেটরস (ট্রাইবুনালস) (রিপিল) অর্ডিন্যান্স ১৯৭৫ (Bangladesh Collaborators (Special Tribunals) (Repeal) Ordinance, 1975) জারি করে দালাল আইন রহিত করলে, আটক, পলাতক ও মুক্ত সব ধরণের দালালের বিচার রহিত হয়ে যায়। ১৯৭৯ সালের ৬ এপ্রিল জাতীয় সংসদে সংবিধানের ৫ম সংশোধনী পাশ হলে, এ অর্ডিন্যান্স আইনের রূপ লাভ করে। এরপর পাকিস্তানি দালালদের বিচারের বিষয় পতিত হয়এক দীর্ঘ শীতনিদ্রায়।
![]() |
| বিচারপতি আবু মো: সায়েম |
হিসাব নিকাশ
পাকিস্তানের সহযোগীদের মধ্যে বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্যে প্রণীত দালাল আইন বিলুপ্তির মাধ্যমে তাদের জঘন্য কার্যের বিচার বন্ধ হলেও, দালালদের নিষ্ঠুরতার শিকার পরিবারের লোকজন তা মেনে নিতে পারেনি, পারেনি দেশের লেখক, কবি, সাংবাদিকসহ সুশীল সমাজের বহু সচেতন মানুষ। পাকিস্তান বাহিনীর নৃশংসতা, পাক-বাহিনীর এদেশিয় দোসরদের বিশ্বাসঘাতকতা, বুদ্ধিজীবি হত্যায় জামায়াতে ইসলামী দলের আল-বদর, আল-শামস ইত্যাদি বাহিনীর প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা নিয়ে শুরু হয় প্রচুর গবেষণা। এসব গবেষণায় উঠে আসে রাজাকার, আল-বদর, আল-শামসদের নিজ দেশবাসির উপর শিহরণ জাগানো বর্বর নিষ্ঠুরতার বিবরণ। পাকিস্তানের সহযোগীদের ভিন্ন ভিন্ন নাম যথা: শান্তিবাহিনীর সদস্য, আল-শামসের সদস্য ইত্যাদি থাকলেও সবাইকে ঢালাওভাবে রাজাকার বলে উল্লেখ করা হতে থাকে। উল্লেখ্য আনসার বাহিনী মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিলে, আনসারদের পরিবর্তে গেজেট দ্বারা সরকারিভাবে রাজাকার নামে একটি বাহিনী গঠন করা হয়। রাজাকার শব্দটির সাথে দেশবাসির ঘৃণা যু্ক্ত হয় পাকিস্তানীদের সহযোগী হয়ে দেশবাসির উপর নির্মম নিষ্ঠুর অত্যাচার চালানোর জন্যে। বেগম সুফিয়া কামাল, শওকত ওসমান, নীলিমা ইব্রাহিম, গাজীউল হক, রাবেয়া খাতুন, সেলিনা হোসেন, জুবায়দা গুলশান আরা, আব্দুর রৌফ চৌধুরী, সৈয়দ শামসুল হক, আব্দুল্লা আল মামুন, রশীদ হায়দার, মুনতাসীর মামুন, মমতাজ উদ্দিনসহ দেশের বহু জ্ঞানীগুণীজন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অগণিত বই রচনা করেন। এসব বইয়ে বর্ণিত মুক্তিযুদ্ধের গৌরব এবং বিরোধীদের স্বদেশের সাথে বেঈমানি, স্বদেশের লোকজনের উপর নির্মম অত্যাচার উৎপীড়ণের বর্ণনায় দেশীয় দালালদের প্রতি তীব্র ঘৃণায় বিষিয়ে ক্রমাগত বিষিয়ে তুলে তরুণদের মন। পক্ষান্তরে মুক্তিযোদ্ধারা বীর হিসেবে স্থান লাভ করেন মানুষের মনে। সরকারি উদ্যোগে হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ১৬ খন্ডে ১৯৮২-৮৩ সালে প্রকাশিত হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্র। মুক্তিযুদ্ধকে উপলব্ধী করতে এ বইটি বিরাট ভূমিকা পালন করে। কারণ এর মধ্য দিয়ে মানুষ মুক্তিযুদ্ধের গতিপ্রকৃতি এবং পাকিস্তানিদের দোসর জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ ইত্যাদির দলের ন্যাক্কর জনক ভূমিকা পুনরাবিস্কার করে। এভাবে শীতনিদ্রার মধ্যে যুদ্ধপরাধের দায়ে বাংলাদেশের দালালদের বিচারের দাবি ক্রমেই শক্তিলাভ করতে থাকে মানুষ বিশেষত তরুণ প্রজন্মের মনে। অপরদিকে মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলাম দল পাকিস্তানের দালালি করলেও, এরা প্রায় নি:শেষ হয়ে যায় রাজনৈতিক দল হিসেবে। উত্থান ঘটতে থাকে ইসলাম ধর্ম ভিত্তিক জামায়াতে ইসলাম দলের, যাদের কর্মীরা মুক্তিযুদ্ধের সময় আল-বদর, আল-শামস হিসেবে বুদ্ধিজীবি হত্যার সাথে জড়িত ছিল বলে ব্যাপকভাবে সমালোচিত ছিল। এদের উত্থান উদীয়মান অসাম্প্রদায়িক তরুণ ও বুদ্ধিজীবি সমাজ সহজভাবে গ্রহণ করেনি। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-এর প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান (১৯৭৭-১৯৮১) জাতিকে রাজনৈতিক দ্বিধাবিভক্তি থেকে মুক্ত করে ঐক্যের রাজনীতি চালুর প্রয়াসে ১৯৭৮ সালে জামায়াতে ইসলামীর উপর থেকে রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে, আসম্প্রদায়িক লোকজনের কাছে তা ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি একটি প্রতারণা মাত্র। ফলে প্রেসিডেন্ট জিয়ার ঐক্য প্রয়াস সফল হয়নি। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে অসাম্প্রদায়িক চেতনা পোষণকারিদের মধ্যে আশা ছিল আওয়ামী লীগ জয় লাভ করবে নির্বাচনে। কিন্তু তাদের আশায় ছাই দিয়ে জয় লাভ করল বিএনপি। আশাহত এসব লোকজন যুদ্ধপরাধী হিসেবে জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য দলের লোকজনের বিচারের দাবিতে জনমত গঠন করে চলছিল দেশব্যাপী। এর মধ্যে পাকিস্তানের পাসপোর্টে বাংলাদেশে ফেরত আসা পাকিস্তান বাহিনীর অন্যতম সহযোগী গোলাম আযমকে ১৯৯১ সালের ২৯ ডিসেম্বর জামায়াতে ইসলামী দলের আমীর নির্বাচন করলে তা আগুণে ঘৃতাহুতি প্রদান করে। এই পটভূমিতে যুদ্ধপরাধীর বিচার ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে একাত্তরের যুদ্ধের অন্যতম শহীদমাতা জাহানারা ইমামকে![]() |
| জাহানারা ইমাম |
আহ্বায়ক করে কবি সুফিয়া কামাল, জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী, লে.কর্নেল (অব:) কাজী নুরুজ্জামান, বিচারপতি কে এম সোবহান প্রমুখ ১০১ জন গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তির সমন্বয়ে গঠিত হয় একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। এর পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী প্রতিরোধ মঞ্চ, ১৪টি ছাত্র সংগঠন, প্রধান প্রধান রাজনৈতিক জোট, শ্রমিক-কৃষক-নারী এবং সাংস্কৃতিক জোটসহ ৭০টি সংগঠনের সমন্বয়ে পরবর্তীতে ১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৯২ ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি’ গঠিত হয়। সর্বসম্মতিক্রমে এর আহ্বায়ক নির্বাচিত হন জাহানারা ইমাম। এই কমিটি ১৯৯২ সালে ২৬ মার্চ ’গণআদালত’ এর মাধ্যমে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একাত্তরে পাকিস্তানিদের বিশ্বস্ত সহচর, বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রবল বিরোধীতাকারি গোলাম আযমের ঐতিহাসিক বিচার অনুষ্ঠান করে। গণআদালাতে গোলাম আযমের বিরুদ্ধে ১০টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উত্থাপিত হয়। ১২ জন বিচারক সমন্বয়ে গঠিত গণআদালতের চেয়ারম্যান জাহানারা ইমাম গোলাম আযমের ১০টি অপরাধ মৃত্যুদন্ডযোগ্য বলে ঘোষণা করেন। এই গণআদালতের সদস্য ছিলেনঃ এডভোকেট গাজিউল হক, ডঃ আহমদ শরীফ, মাজহারুল ইসলাম (স্থপতি), ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ (বর্তমান আইন মন্ত্রী), সুফিয়া কামাল, কবীর চৌধুরী, কলিম শরাফী, শওকত ওসমান, লেঃ কর্ণেল (অবঃ) কাজী নুরুজ্জামান, লেঃ কর্ণেল (অবঃ) আবু ওসমান চৌধুরী এবং ব্যারিস্টার শওকত আলী খান।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এমনকি বিদেশেও গঠিত হয় নির্মূল কমিটি এবং শুরু হয় ব্যাপক আন্দোলন। পত্র-পত্রিকায় সংবাদ শিরোনাম হয়ে উঠলে আন্তর্জাতিক মহলেও ব্যাপক পরিচিতি অর্জন করেন জাহানারা ইমাম। গোলাম আযমসহ একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবির আন্দোলনকে সমর্থন দেয় ইউরোপীয় পার্লামেন্ট। আন্দোলন ব্যাপকতা লাভ করে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে। ২৬ মার্চ ১৯৯৩ সালে স্বাধীনতা দিবসে গণআদালত বার্ষিকীতে জাহানারা ইমামের নেত্রত্বে গণতদন্ত কমিটি ঘোষিত হয় এবং আরো আটজন যুদ্ধাপরাধীর নাম ঘোষণা করা হয়। এই ঘৃণ্য আটজন যুদ্ধাপরাধীর নামঃ আব্বাস আলী খান, মতিউর রহমান নিজামী, মোঃ কামরুজ্জামান, আবদুল আলীম, দেলোয়ার হোসেন সাঈদী, মওলানা আবদুল মান্নান, আনোয়ার জাহিদ এবং আবদুল কাদের মোল্লা। ২৬ মার্চ ১৯৯৪ সালে স্বাধীনতা দিবসে গণআদালতের ২য় বার্ষিকীতে গণতদন্ত কমিশনের চেয়ারম্যান কবি বেগম সুফিয়া কামাল ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের সামনে রাজপথের বিশাল জনসমাবেশে জাহানারা ইমামের হাতে জাতীয় গণতদন্ত কমিশনের রিপোর্ট হস্তান্তর করেন। গণতদন্ত কমিশনের সদস্যরা হচ্ছেনঃ শওকত ওসমান, কে এম সোবহান, সালাহ উদ্দিন ইউসুফ, অনুপম সেন, দেবেশ চন্দ্র ভট্টাচার্য, খান সারওয়ার মুরশিদ, শামসুর রাহমান, শফিক আহমেদ, আবদুল খালেক এবং সদরুদ্দিন। এই সমাবেশে আরো আটজন যুদ্ধাপরাধীর বিরুদ্ধে তদন্ত অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেয়া হয় (উইকিপিডিয়া থেকে সংগৃহীত তথ্য মোতাবেক।)।
একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির পাশাপাশি গত দুই দশকে বিভিন্ন গবেষক, সংস্থা, মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের হাতে পাইকারি হত্যা, খুন, ধর্ষন, লুন্ঠন, অগ্নিসংযোগ, ধর্মান্তরকরণ ইত্যাদি অপরাধের প্রত্যক্ষদর্শী স্বাক্ষীদের জবানবন্দী প্রকাশ করেন, মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডারসহ সশস্ত্র বাহিনীর উর্ধতন কর্মকর্তাগণও প্রকাশ করেন মুক্তিযুদ্ধের সময়কার বাঙালি জাতির গৌরবজনক ভূমিকা ও প্রতিপক্ষের নিষ্ঠুর নির্যাতনের ভয়াবহ বিবরণ। সেই সাথে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন সেক্টরের অধিনায়কগণ তাদের সংগঠন সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম যুদ্ধপরাধের বিচারে সোচ্চার হয়ে দেশব্যাপী প্রচারণা চালায়। এর মধ্যে ১৯৯৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বুদ্ধিজীবি হত্যার অন্যতম সন্দেহভাজন চৌধুরী মঈনুদ্দীন, আশরাফুজ্জামান এবং অন্যান্যের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর অধ্যাপক গিয়াস উদ্দিনকে হত্যার দায়ে মামলা দায়ের করেন তাঁর বোন ফরিদা বানু। মাগুরাতেও খাদেজা নামে এক নারী ১০ জন দালালের বিরুদ্ধে তাঁর ভাই মুক্তিযোদ্ধা হাশেম মোল্লাকে হত্যার জন্যে খুনের মামলা দায়ের করেন। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এলে তারা সরকার গঠন করে ৪ দলকে নিয়ে যার বড় অংশীদার ছিল জামায়াতে ইসলাম। এসময় জামায়াতে ইসলামের মওলানা নিজামী এবং মুজাহিদ মন্ত্রীত্ব লাভ করলে তা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকদের জন্যে বয়ে আনে বেদনাদায়ক অপমান। কারণ এ দুজনই ছিল পাকিস্তানের অনুগত এবং বাংলাদেশ বিরোধী। এছাড়াও এদের বিপক্ষে ছিল পাকিস্তান রক্ষায় মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের অনুসারীদের খতমের জন্যে গঠিত আল-শামস, আল-বদর নামে সশস্ত্র বাহিনী গঠন, নেতৃত্বদান এবং পাইকারি হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে তাদের সক্রিয় অংশ গ্রহণের অভিযোগ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী এই দুজন গুরুত্বপূর্ণ লোক মন্ত্রী হয়ে গাড়ী ও তাদের বাড়ীতে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কারো পক্ষে সহ্য করা সম্ভব ছিল না।
পুনরুত্থান
এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধপরাধের বিচারের প্রশ্নে জাতির তরুণ প্রজন্ম সাহিত্যিক, সাংবাদিক, গবেষক, কবি, নাট্যকার, সেক্টর কমান্ডার, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির দ্বারা বিপুলভাবে প্রভাবিত হয়ে সোচ্চার হয়ে উঠে। ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে অন্যান্য প্রতিশ্রুতিসহ ১৯৭১ সালের যুদ্ধপরাধীদের বিচার করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিপুলভাবে জয়ী হয় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত মহাজোট। পক্ষান্তরে বিএনপি-এর নেতৃত্বাধীন ৪ দলীয় ঐক্যজোট এ নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয় বরণ করে। অনেকে মনে করেন নির্বাচনের ফলাফলের অন্যতম নির্ণায়ক ছিল যুদ্ধপরাধীদের দাবির প্রশ্ন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রত্যক্ষ বিরোধীতা করেছিল জামায়াতে ইসলাম। এছাড়া এ দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে ছিল পাকিস্তানিদের দোসর হয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংগঠনের অভিযোগ। বিএনপি আগের মেয়াদে ৫ বছর ক্ষমতায় থাকার সময় জামায়াতে ইসলামী দলের দুজন নেতাকে মন্ত্রী বানিয়েছিল, যারা ছিল জনগণের চোখে ৭১-এর যুদ্ধপরাধী। এরা মন্ত্রী হওয়ার সূযোগে গাড়ি ও বাড়িতে বাংলাদেশের পতাকা ওড়ায়, যা ছিল মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের লোকদের নিকট অসহনীয় অপমানের শামিল। তরুণ প্রজন্ম নির্বাচনের সময় প্রত্যাখ্যান করে জামায়াতে ইসলামীকে। বিএনপিও জামায়াতের অংশীদার হিসেবে এর প্রতিফল ভোগ করে।আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর তার নির্বাচনী এজেন্ডা বাস্তবায়নের পথে যুদ্ধপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ গ্রহণ করে। তবে বিতর্কিত ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরকারের প্রত্যক্ষ উদ্যোগ পরিহার করে, পরোক্ষভাবে নিজ উদ্দেশ্য হাসিলের নীতি অনুসরণে দক্ষ আওয়ামী লীগ যুদ্ধপরাধের বিচারের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটায়নি। যুদ্ধপরাধের বিচারের জন্যে সরকার থেকে কোন প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়নি সংসদে। পরিবর্তে ২০০৯ সালের ২৯ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে যুদ্ধপরাধীদের বিচারের প্রস্তাব উত্থাপন করেন সিলেট-৩ আসন থেকে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের এমপি মাহমুদুস সামাদ চৌধুরী। বিরোধী দলের সংসদ বর্জনের কারণে মন্ত্রী ব্যতীত একজন সাংসদের আনীত প্রস্তাব নজীরবিহিনভাবে অতিদ্রুতায় সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয় জাতীয় সংসদে জানুয়ারি মাসের ২৯ তারিখে (দেখুন ডেইলি স্টার, ৩০ জানুয়ারি ২০০৯) । এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৯ সালের মার্চের ২৫ তারিখে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক আন্ত-মন্ত্রণালয় বৈঠকে সরকার সিদ্ধান্ত নেয় যে যুদ্ধপরাধীদের বিচার হবে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনাল) আইন,১৯৭৩-এর অধীনে এবং বিচারের জন্যে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা হবে হালনাগাদ করার জন্যে (ডেইলি স্টার ২৬ মার্চ ২০০৯)। অত:পর সংশোধনী আনয়নের জন্যে বিষয়টি ২০০৯ সালের ২১ মে তারিখে প্রেরিত হয় আইন কমিশিনে। আইন কমিশন আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনাল) আইন, ১৯৭৩-এ কি কি সংশোধণী আনা যায়, সে সম্পর্কে দেশের খ্যাতনামা ৩৩ জন আইনবিদ ও আইন বিজ্ঞানীর নিকট মতামত চেয়ে অনুরোধ করে। যাদেরকে মতামত দেবার জন্যে অনুরোধ করা হয়, তারা হলেন, জাস্টিস কামাল উদ্দীন হোসেন, জাস্টিস এ.টি.এম, আফজাল, জাস্টিস মুহম্মদ হাবিবুর রহমান, জাস্টিস মোস্তফা কামাল, জাস্টিস মুহম্মদ গোলাম রব্বানী, জাস্টিস এবাদুল হক, ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ কুষ্টিয়ার ইসলামী ইউনিভারসিটি, ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের প্রধানবৃন্দ, সুপ্রীম কোর্ট বারের সভাপতি ও সেক্রেটারি, ঢাকা বারের সভাপতি ও সেক্রেটারি, মুহম্মদ ওয়ালীউর রহমান, মুহম্মদ টি এইচ খান, রফিকুল হক, ড. এম জহির, খন্দকার মাহবুব উদ্দিন আহমদ, ড. কামাল হোসেন, এম আমীরুল ইসলাম, মাহমুদুল ইসলাম, রুকনউ্দ্দিন মাহমুদ, আব্দুল বাছেত মজুমদার, আজমালুল হুসেইন, মঈনুল হোসেন, আকতার ইমাম, শেখ রাজ্জাক আলী, আব্দুর রাজ্জাক, তওফিক নেওয়াজ, আব্দুল রাজ্জাক খান এবং খান সাইফুর রহমান। এদের মধ্যে কেবল বিচারপতি কাজী এবাদুল হক এবং ড. আব্দুল্লা আল ফারুকের মতামত নিয়ে আইন কমিশনের ৩ জন সদস্য (চেয়ারম্যানসহ) আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনাল) আইন, ১৯৭৩-এর সংশোধনী সম্বলিত প্রতিবেদন দাখিল করেন সরকারের নিকট। এতবড় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অন্যদের কাছ থেকে কেন সংশোধনী প্রস্তাব পাওয়া গেল না, বা কেন তারা দেননি, তাদের মতামত পাওয়ার জন্যে কি ধরণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল, সে বর্ননা তাঁদের প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই। এটা এ জন্যে উল্লেখ করা হলো যে, অনেকের ধারণা সংশোধনী প্রস্তাবটি দেশের বরেন্য আইনবিদদের দ্বারা পরীক্ষিত হয়ে বর্তমান রূপ লাভ করেছে। যেমন উইকিপিডিয়ায় উল্লেখ করা হয়েছে, "As a part of the amendment procedure the government sent the act to the Law Commission where it was scrutinised by specialist lawyers, judges and professors of the universities
এখানে একটা প্রশ্ন ওঠে। সেটা হলো দেশের বরেণ্য ব্যাক্তিগণও কেন স্বউদ্যোগে এ বিষয়ে মুখ না খুলে নীরব রইলেন । যে আইনটি প্রণীত হয়েছিল আত্মসমর্পনকারি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর যেসব সদস্য যুদ্ধপরাধের সাথে জড়িত ছিল তাদের বিচারের জন্যে, যে আইনটি পাকিস্তানি যুদ্ধপরাধীদের ক্ষমার মধ্য দিয়ে শেখ মুজিবের আমলব্যাপী আকার্যকর থেকে যায় এবং হিমাগারে পড়ে থাকে ৩৬/৩৭ বছর, সে আইনে পাকিস্তানিদের বাঙালি দোসদের বিচার কতটুকু সঙ্গত ছিল এ বিষয়ে শুরুতেই কনসেনসাস জরুরি ছিল। সরকার তার রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও উদ্দেশ্য পুরণের জন্যে যে সহজ পথ বেছে নেবে, তাতে সন্দেহ নেই। তারপরও নিয়ম রক্ষার খাতিরে হোক বা আন্তরিকভাবেই হোক, আইন কমিশন দেশের বরেণ্য আইনবিদদেরকে পাকিস্তান সমর্থনকারি বাঙালিদের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের বিষয়ে মতামত জানানোর অনুরোধ জানিয়েছে। তা সত্বেও এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বরেণ্য আইনজীবিদের নীরবতার অর্থ আর কি হতে পারে? বিশ্বের কোথাও নিজ নাগরিকদের যুদ্ধপরাধের জন্যে দেশীয় আইনে বিচারের উদ্যোগ নজীরবিহীন। তাই বলে তারা বিচারের উর্ধে থাকতে পারেনা। ৭১ সালে পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে বাঙালি জাতির স্বাধীনতার আকাঙ্খার বিপরীতে থেকে যারা নৃশংস কর্মকান্ডে অংশ নিয়েছে বা মদদ দিয়েছে, তাদের বিচারের মাধ্যমে উপযুক্ত দন্ডদানের প্রশ্নে কোন দ্বিমত থাকতে পারেনা। তবে যদি অতীতে তাদের কোন না কোন ভাবে ক্ষমা করা হয়ে থাকে, তাহলে সেটাও খোলাসা করা বরেণ্য আইনজীবিদের নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। এ বিষেয় তাদেঁর নীরবতা কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না। দেশব্যাপী যখন দেশীয় পাকিস্তানি দালালদের অপরাধের বিচারের জন্যে দাবি উঠছে, তখন ঐ দাবীর যথার্থতার প্রশ্নে মতামত দেয়া অথবা দাবির প্রেক্ষিতে কি ব্যবস্থা নেয়া যায়, সে বিষয়ে দিক নির্দেশনা দেয়া দেশের খ্যাতিমান আইনবিদদের অবশ্য কর্তব্য। তারা অনুরাগ বিরাগের উর্ধে ওঠে জাতির একটি ক্রান্তি লগ্নে বিবেক অনুযায়ী পরামর্শ দিলে, সহজ হয়ে যেতো আজকের অনেক বিতর্কিত বিষয়। বিজ্ঞ আইনজীবি ও আইন বিজ্ঞানিদের দ্বারা যে কয়টি বিষয়ে মতামত জরুরি ছিল, সেগুলো আমার বিবেচনায় নিম্নরূপ:
১. ত্রিপক্ষীয় চু্ক্তি অনুযায়ী উপমহাদেশে শান্তি ও সৌহার্দ স্থাপনের জন্যে পাকিস্তানি যুদ্ধপরাধীদের ক্ষমা করে দেয়ার পর, তাদের বাঙালি দোসরদের বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনাল) আইন, ১৯৭৩ অনুযায়ী কতটুকু যুক্তিযুক্ত ছিল।
২. বাংলাদেশ কলাবরেটর (বিশেষ ট্রাইবুনাল) অর্ডার ১৯৭২ জারি করা হয়েছিল বাঙালিদের মধ্যে যারা হত্যা, ধর্ষন ইত্যাদি অপরাধে যুক্ত ছিল তাদের বিচারের জন্যে। ১৯৭৫ সালে বিলুপ্ত এ আইনটি পুনরুজ্জীবন করে ১৯৭১ সালে যেসব বাঙালি পাকিস্তানিদের সহযোগী হয়ে নৃশংস কর্মকান্ডে জড়িত ছিল তাদের বিচার করা নৈতিক ও আইনি দিক থেকে যৌক্তিক ছিল কি না।
৩. আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনাল) আইন, ১৯৭৩ অনুযায়ী বিচার করতে গেলেও যেখানে সংশোধনীর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছে সরকার, সেখানেও বরেণ্য আইনবিদবৃন্দ ন্যায় বিচার নিশ্চিত করতে আইনের কি কি পরিবর্তন দরকার, সে সম্বন্ধে মূল্যবান সুপারিশ রাখার অবাধ সূযোগ ছিল। বিশেষত: নূরেনবার্গ ট্রায়ালের পর যুদ্ধপরাধ আইন ক্রমবিবর্তনের মধ্য দিয়ে একটি আন্তর্জাতিক রূপ লাভ করেছিল রোম স্ট্যাটুসের দ্বারা। ফলে দেশিয় যুদ্ধপরাধের আইনের সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গতি সাধন করার জন্যে কি কি পরিবর্তন আনা প্রয়োজন সে সম্পর্কে আলোক পাত করা। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রণীত যুদ্ধপরাধের আইনটির আন্তর্জাতিক মান রক্ষা ও বিচারের স্বচ্ছতার জন্যে কী করণীয় তা জনগণও জানার সূযোগ লাভ করতো।
কিন্তু তারা এ দায়িত্ব পালন করেন নি। ফলে সরকার একাই তার রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সহজ পথ হিসেবে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনাল) আইন, ১৯৭৩ নিজেদের সুবিধামতো সংশোধনের পথ বেছে নেয়। সেমতে, আইন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনাল) আ্ইন, ১৯৭৩-এর সংশোধনের লক্ষে জাতীয় সংসদে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনালস) (সংশোধনী) আইন, ২০০৯ (২০০৯ সালের ৫৫ নং আইন) উত্থাপিত হয় ২০০৯ সালের ৮ জুলাই বুধবার। ঐদিনই আইনটি প্রেরিত হয় আইন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিতে। কমিটি বৃহস্পতিবার সকালের মধ্যে বাছাই সমাপ্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করে এবং রাতের অধিবেশনে বিরোধী দলের অনুপস্থিতে সর্বসম্মতিক্রমে পাশ হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনালস) (সংশোধনী) আইন, ২০০৯ (ডেইলি স্টার ১০ জুলাই ২০০৯)।
এখানে বিরোধী দলের দায়িত্বহীনতার প্রশ্নও আলোচনার দাবি রাখে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার স্বপক্ষ ও বিপক্ষের শক্তি একাকার করে দেশ গঠনের জন্যে চেয়েছিলেন একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠনের। তিনি চেয়েছিলেন জাতি অতীতের তিক্ততা ভুলে গিয়ে এক হয়ে শরীক হোক দেশের উন্নয়ন কর্মকান্ডে। প্রেসিডেন্ট সায়েমের কথা যতই বলা হোক না কেন Bangladesh Collaborators (Special Tribunals) (Repeal) Ordinance, 1975- আইনে পরিণত করার জন্যে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা অনস্বীকার্য। মু্ক্তিযুদ্ধের সরাসরি বিরোধীতা করেছেন, পাকিস্তানি সৈন্যদের নৃশংসতার সাথে জড়িত ছিলেন, এমন লোকদেরও তিনি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে স্থান দিয়েছেলেন। এজন্যে তিনি প্রবলভাবে সমালোচিত হয়েছেন বিরোধীদের দ্বারা। কিন্তু যখন সময় এলো জিয়ার অনুসিৃত নীতির পক্ষে শক্তভাবে দাড়ানোর, তখন বিএনপি-র নীরবতার সকল সুযোগ নিল তাদের চির প্রতিদ্বন্দ্বি আওয়ামী লীগ। এমনকী বিএনপি-র সাধারণ সম্পাদক এই বলে মন্তব্য করলেন যে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার স্বচ্ছ হলে বিএনপির আপত্তি নেই।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার স্বচ্ছ হলে বিএনপির আপত্তি নেই
আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনালস) (সংশোধনী) আইন, ২০০৯ পাশ হয়ে গেলো কোন প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই। ২০১০ সালের ২৫ মার্চ আইন মন্ত্রী এক সাংবাদিক সন্মেলেন জানান যে ১৯৭১ সালে যেসব বাঙালি মানবতাবিরোধী অপরাধের সাথ জড়িত ছিল তাদের বিচার হবে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনাল) আইন, ১৯৭৩-এর অধীনে। তিনি আরো জানান যে, সংশোধিত আইনের আওতায় হাইকোর্টের বিচারপতি মুহম্মদ নিজামুল হককে চেয়ারম্যান করে এবং বিচারপতি এ.টি.এম ফজলে কবীর ও অবসর প্রাপ্ত জেলা জজ এ,কে,এম জাহির আহমেদকে নিয়ে গঠিত হলো মানবতাবিরোধী অপরাধে দেশের নিজ নাগরিকদের বিচারের জন্যে ট্রাইবুনাল গঠিত হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) অ্যাক্টের ৬ ধারার ক্ষমতাবলে
প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ করে। এর
আগে সকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর সচিবালয়ের দপ্তরে ট্রাইব্যুনাল,
তদন্ত সংস্থা ও আইনজীবী প্যানেলের নাম অনুমোদন করেন। রাষ্ট্রপতি জিল্লুর
রহমান দুপুরে ট্রাইব্যুনালের নাম অনুমোদন করেন। রাতেই তা গেজেট আকারে
প্রকাশ করা হয়। আইনজীবী প্যানেল: ১২ সদস্যের আইনজীবী প্যানেলের প্রধান
(চিফ প্রসিকিউটর) করা হয়েছে গোলাম আরিফকে। অন্য সদস্যরা হচ্ছেন: সৈয়দ
রেজাউর রহমান, গোলাম হাসনাইন, রানা দাশগুপ্ত, জহিরুল হক, নুরুল ইসলাম, সৈয়দ
হায়দার আলী, খন্দকার আবদুল মান্নান, মোশারফ হোসেন, জিয়াদ-আল-মালুম,
সানজিদা খানম ও সুলতান মাহমুদ।তদন্তকারী সংস্থা: সাবেক জেলা জজ ও আইন
মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব আবদুল মতিনের সমন্বয়ে সাত সদস্যের
তদন্তকারী সংস্থা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সংস্থার অন্য সদস্যরা হচ্ছেন: পুলিশের
সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক আবদুর রহিম, সাবেক উপমহাপরিদর্শক কুতুবুর
রহমান, মেজর (অব.) এ এস এম সামসুল আরেফিন, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের
(সিআইডি) অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক মীর শহীদুল ইসলাম, একই বিভাগের পরিদর্শক
নুরুল ইসলাম ও আবদুর রাজ্জাক খান। সংবাদ সম্মেলনে আইনমন্ত্রী বলেন,
গতকাল থেকেই ট্রাইব্যুনাল, আইনজীবী প্যানেল ও তদন্তকারী সংস্থার কার্যক্রম
শুরু হয়েছে। তদন্তে যাদের নাম আসবে তারাই বিচারের সম্মুখীন হবে। তথ্য,
সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহসহ আনুষঙ্গিক কাজে তদন্তে কিছু সময় লাগবে বলে জানান
তিনি।(দেখুন প্রথম আলো ২৬ মার্চ ২০১০)। সরকারের এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করার সময় বিএনপি নীরবতা বজায় রাখার নীতিতে অবিচল থাকে এবং জামাতে ইসলামী জানায় যে, তারা অপেক্ষা ও দেখার নীতি গ্রহণ করেছে। (দেখুন : "Jamaat to wait, see" ডেইলি স্টার ১৬ মার্চ ২০১০)।
দিনপঞ্জি:
২৪ জানুয়ারি ১৯৭২ : বাংলাদেশ কলাবরেটর (স্পেশাল ট্রাইবুনাল) আইন, ১৯৭২ জারি। ২০ জুলাই ১৯৭৩ : আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনালস) আ্ইন, ১৯৭৩ প্রণয়ন
৩১ ডিসেম্বর ১৯৭৫ : বাংলাদেশ দালাল (বিশেষ ট্রাইবুনালস) (রিপিল) অর্ডিন্যান্স, ১৯৭৫ জারি।
২৯ ডিসেম্বর ১৯৯১ : গোলাম আযম জামায়াতে ইসলামীর আমীর নির্বাচিত
১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৯২ : ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি’ -এর আত্মপ্রকাশ।
২৬ মার্চ ১৯৯২ : 'গণ-আদালত" কর্তৃক গোলাম আযমকে ১০টি অভিযোগে মৃত্যুদন্ডযোগ্য বলে রায় ঘোষণা।
২৯ ডিসেম্বর ২০০৮ : সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও তাদের জোট সাধারণ নির্বাচনে নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা
লাভ।
২৯ জানুয়ারি ২০০৯ : যুদ্ধপরাধীদের বিচারের জন্যে এম.পি. মাহমুদুস সামাদের প্রস্তাব উত্থাপন এবং সংসদের সমর্থন।
২৫ মার্চ ২০০৯ : স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আন্ত:মন্ত্রণালয় বৈঠকে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনালস) আইন, ১৯৭৩-এর
অধীনে যুদ্ধপরাধের বিচারের ও ঐ আইন যুগোপযোগী করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ।
২১ মে ২০০৯ : আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনালস) আইন, ১৯৭৩-এর সংশোধনী আনয়নের জন্যে আইন
কমিশনে প্রেরণ।
২৪ জুন ২০০৯ : আইন কমিশন কর্তৃক সরকারের নিকট আইনের সংশোধনীর সুপারিশ প্রণয়ন।
০৯ জুলাই ২০০৯ : সংসদে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনালস) (সংশোধনী) আইন, ২০০৯ পাশ।
১৪ জুলাই ২০০৯ : রাস্ট্রপতি কর্তৃক আইন অনুমোদন।
২৫ মার্চ ২০১০ : আইনমন্ত্রী কর্তৃক ট্রাইবুনাল, আইনজীবি প্যানেল ও তদন্ত দল গঠনের সংবাদ প্রকাশ।
আইনমন্ত্রী
জানান, আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) অ্যাক্টের ৬ ধারার ক্ষমতাবলে
প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ করে সরকার এই ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছে।
এর আগে সকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর সচিবালয়ের দপ্তরে ট্রাইব্যুনাল, তদন্ত সংস্থা ও আইনজীবী প্যানেলের নাম অনুমোদন করেন। রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান দুপুরে ট্রাইব্যুনালের নাম অনুমোদন করেন। রাতেই তা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়।
আইনজীবী প্যানেল: ১২ সদস্যের আইনজীবী প্যানেলের প্রধান (চিফ প্রসিকিউটর) করা হয়েছে গোলাম আরিফকে। অন্য সদস্যরা হচ্ছেন: সৈয়দ রেজাউর রহমান, গোলাম হাসনাইন, রানা দাশগুপ্ত, জহিরুল হক, নুরুল ইসলাম, সৈয়দ হায়দার আলী, খন্দকার আবদুল মান্নান, মোশারফ হোসেন, জিয়াদ-আল-মালুম, সানজিদা খানম ও সুলতান মাহমুদ।
তদন্তকারী সংস্থা: সাবেক জেলা জজ ও আইন মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব আবদুল মতিনের সমন্বয়ে সাত সদস্যের তদন্তকারী সংস্থা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সংস্থার অন্য সদস্যরা হচ্ছেন: পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক আবদুর রহিম, সাবেক উপমহাপরিদর্শক কুতুবুর রহমান, মেজর (অব.) এ এস এম সামসুল আরেফিন, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক মীর শহীদুল ইসলাম, একই বিভাগের পরিদর্শক নুরুল ইসলাম ও আবদুর রাজ্জাক খান।
সংবাদ সম্মেলনে আইনমন্ত্রী বলেন, গতকাল থেকেই ট্রাইব্যুনাল, আইনজীবী প্যানেল ও তদন্তকারী সংস্থার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তদন্তে যাদের নাম আসবে তারাই বিচারের সম্মুখীন হবে। তথ্য, সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহসহ আনুষঙ্গিক কাজে তদন্তে কিছু সময় লাগবে বলে জানান তিনি। - See more at: http://www.prothom-alo.com/detail/date/2010-03-26/news/51693#sthash.EnF6HilX.dpuf
এর আগে সকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর সচিবালয়ের দপ্তরে ট্রাইব্যুনাল, তদন্ত সংস্থা ও আইনজীবী প্যানেলের নাম অনুমোদন করেন। রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান দুপুরে ট্রাইব্যুনালের নাম অনুমোদন করেন। রাতেই তা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়।
আইনজীবী প্যানেল: ১২ সদস্যের আইনজীবী প্যানেলের প্রধান (চিফ প্রসিকিউটর) করা হয়েছে গোলাম আরিফকে। অন্য সদস্যরা হচ্ছেন: সৈয়দ রেজাউর রহমান, গোলাম হাসনাইন, রানা দাশগুপ্ত, জহিরুল হক, নুরুল ইসলাম, সৈয়দ হায়দার আলী, খন্দকার আবদুল মান্নান, মোশারফ হোসেন, জিয়াদ-আল-মালুম, সানজিদা খানম ও সুলতান মাহমুদ।
তদন্তকারী সংস্থা: সাবেক জেলা জজ ও আইন মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব আবদুল মতিনের সমন্বয়ে সাত সদস্যের তদন্তকারী সংস্থা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সংস্থার অন্য সদস্যরা হচ্ছেন: পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক আবদুর রহিম, সাবেক উপমহাপরিদর্শক কুতুবুর রহমান, মেজর (অব.) এ এস এম সামসুল আরেফিন, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক মীর শহীদুল ইসলাম, একই বিভাগের পরিদর্শক নুরুল ইসলাম ও আবদুর রাজ্জাক খান।
সংবাদ সম্মেলনে আইনমন্ত্রী বলেন, গতকাল থেকেই ট্রাইব্যুনাল, আইনজীবী প্যানেল ও তদন্তকারী সংস্থার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তদন্তে যাদের নাম আসবে তারাই বিচারের সম্মুখীন হবে। তথ্য, সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহসহ আনুষঙ্গিক কাজে তদন্তে কিছু সময় লাগবে বলে জানান তিনি। - See more at: http://www.prothom-alo.com/detail/date/2010-03-26/news/51693#sthash.EnF6HilX.dpuf



No comments:
Post a Comment