ভূমিকা:
বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের প্রায় ৪০ বছর পর স্বাধীনতার বিরোধীতা করে যারা পাকিস্তান সরকারকে সাহায্য-সহযোগীতা করা অবস্থায় পাইকারি হারে খুন, হত্যা, ধর্ষণ ইত্যাদিতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সহায়তা করেছে বা নিজে করেছে বা প্ররোচিত করেছে, তাদেরকে আন্তর্জাতিক অপরাধ তথা মানবতাবিরোধী অুপরাধে অভিযুক্ত করে বিচারের আওতায় আনা হচ্ছে। এ পর্যন্ত দুজনের বিচার সম্পন্ন হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল-২ গত ২১ জানুয়ারি ২০১৩ তারিখে একজন পলাতক আসামী আবুল কালাম আজাদকে তার অনুপস্থিতিতে (প্রকৃতপক্ষে তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন) মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করেছে এবং ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তারিখে যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দন্ডিত করেছে অভিযুক্ত কাদের মোল্লাকে। মানবতাবিরোধী অপরাধে আরো কয়েকজন আটক আছে এবং তাদের বিচার চলমান রয়েছে। যে আইনে এইসব মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার হচ্ছে সে আইনের নাম আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রা্ইবুনাল) আইন ১৯৭৩।মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের পটভূমি:
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের স্বাধিকারের আন্দোলন নির্মূলের জন্যে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাঙালি জাতির নিরস্ত্র জনগণের উপর![]() |
| ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত্রে শুরু হওয়া অপারেশন সার্চলাইটের বলি |
![]() |
| পাকিস্তানি সৈন্যদের আত্মসমর্পনের দলিল |
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে পাকিস্তানি সৈন্যরা বাংলাদেশের বিভিন্ন জনপদে হানাদেয় এবং পাইকারি হারে মানুষ হত্যা, খুন, গণধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুন্ঠনসহ বিভিন্ন অপকর্ম সংগঠিত করে। তাদের এইসব অপকর্মে পাকিস্তান সমর্থনকারি কিছু বাঙালি সক্রিয় সহযোগীতা, সমর্থন ও উৎসাহ যোগায়। এরা নিজেরাও পাকিস্তানিদের সঙ্গে জড়িত হয় এইসব জঘন্য কাজে। এইসব কুকর্মে বাঙালিদের মধ্যে দলগতভাবে যারা সমর্থন যোগায় তাদের মধ্যে ছিল মুসলিম লীগ, জামাতে ইসলাম, নেজামে ইসলামসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল এবং বাহিনী হিসেবে যারা সেনাবাহিনীর সাথে সক্রিয়ভাবে এই সব হীন কাজে অংশ গ্রহণ করে তাদের মধ্যে ছিল রাজাকার বাহিনী, আল শামস, আলবদর নামে কুখ্যাত সশস্ত্র বাহিনী। এই সব সশস্ত্র বাহিনী ছিল আত্মসমর্পণের দলিলে বণিত 'সিভিল আর্মড ফোর্সের অন্তর্গত। রাজনৈতিকদলগুলো পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীকে সমর্থন, সাহায্য, সহযোগীতা দানের জন্যে তাদের দেশব্যাপী নেটওয়ার্কের মাধ্যমে গঠন করে শান্তি বাহিনী। রাজাকার বাহিনী গঠন করা হয় একটি অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে। আল-শামস, আল-বদর বাহিনী গঠন করে জামায়াতে ইসলাম নামে একটি রাজনৈতিক দল।
মাত্র ৯ মাসের মধ্যে বাংলাদেশ শত্রুমুক্ত হলেও, বাঙালি জাতিকে এর জন্যে চরম মূল্য দিতে হয়েছে। দখলদারিত্বের সময় পাকিস্তানি সৈন্যরা বাংলাদেশের সর্বত্র হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে, শিশু,যুবা, নারী, বৃদ্ধ কেউ তাদের হাত থেকে রেহাই পায়নি। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাড়খার করেছে, গ্রাম শুদ্ধ লোকজনকে হত্যা করেছে পালানোর পথ বন্ধ করে। হত্যার সাথে সাথে তারা হাজার হাজার যুবতি, কিশোরিকে ধর্ষন করেছে, ব্যাংকারে পর্যন্ত বহু নারীকে আটকে রে্খে ধর্ষণ করেছে দিনের পর দিন। সাধারণ সৈনিক থেকে সেনাপতি নিয়াজি পর্যন্ত সবাই এই জঘন্য কাজে অংশ নিয়েছে। পাকিস্তানিদের অত্যাচার উৎপীড়ণে প্রায় ১ কোটি লোক শরণার্থী হয়ে আশ্রয় নিয়েছে ভারতে। পাকিস্তানিদের এই সব জঘন্য কাজে মদদ দিয়েছে শান্তি কমিটির লোকজন, সাহায্য সহযোগীতা করেছে বিভিন্ন নামের বাহিনীগুলো। সহযোগীতা করেই তারা ক্ষান্ত হয়নি, নিজেরাও পাকিস্তানি সৈন্যদের মতো খুন, ধর্ষণ, অগ্রিসংযোগ, লুন্ঠনসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে অংশ নিয়েছে। শত্রুমুক্ত হওয়ার প্রাক্কালে দেশের বরেণ্য বুদ্ধিজীবিদেরকে হত্যার সাথে রাজাকার, আল-শামস, আল-বদর বাহিনীর সম্পৃক্ততা তাদেরকে দেশের মানুষের কাছে চরম ঘৃণার পাত্র হিসেবে পরিগণিত তুলে এবং অদ্যাবধি এই ঘৃণা আগের প্রজন্ম থেকে বর্তমান প্রজন্মে সঞ্চারিত হয়েছে।
দেশ শত্রুমুক্ত হওয়ার পর জনগণ সোচ্চার হয়ে উঠে পাকিস্তানি সৈন্যদের ও তাদের সহযোগীদের বিচারের দাবিতে। বাংলাদেশ সরকারের তদানিন্তন প্রধানমন্ত্রী ও অবিসংবাদী নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানের বন্দীত্ব ঘুচিয়ে দেশে ফেরার পর আমেরিকান ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন বা এবিসি-এর প্রতিবেদকের নিকট এই বলে মন্তব্য করেন যে, আমি অবশ্য তাদের বিচার করব। কোন দেশ কি ৩০ লক্ষ লোকের হত্যাকারিদের (বিনা বিচারে) মুক্তি দিতে পারে? (“I will definitely put them on trial. Can any country free those who have killed three million people?”)
পাকিস্তানিদের সহযোগী শান্তি কমিটির সদস্যদের মধ্যে যারা ছিল সঙ্গতিপূর্ণ তাদের অনেকেই তখন নিরাপত্তার জন্যে গ্রাম ছেড়ে আত্মগোপন করে ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে, অনেকে চলে যায় বিদেশ। আল-বদর, আল-শামসের সদস্যরাও গা ঢাকা দেয়। প্রাণ বাচানোর জন্যে তখন অনেক দালাল আশ্রয় নেয় স্বেচ্ছাকারাবাসের, কেউ কেউ আশ্রয় নেয় মুক্তিযোদ্ধা আত্মীয়-স্বজনদের নিরাপত্তার। একটি প্রবাসী সরকার দেশে এসেই শান্তি-শৃংখলা স্থাপন করবে এমন আশাকরা যায় না। সেজন্যে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার দেশ শত্রুমুক্ত হওয়ার মাত্র ৪০ দিনের মধ্যে পাকিস্তানিদের দেশীয় দোসর বা দালালদের হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ইত্যাদি অপরাধের বিচারের জন্যে ২৪ জানুয়ারি বাংলাদেশ কলাবরেটরস (স্পেশাল ট্রাইবুনাল) আইন, ১৯৭২ (The Bangladesh Collaborators (Special Tribunal) Act, 1972) প্রণয়ন করে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, স্বাধীনতার প্রথম প্রহরে সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ৯ মাসের অকার্যকারিতাকে অতিক্রম করে স্বাভাবিক কাজকর্মের ছন্দে ফিরিয়ে আনা ছিল দুস্কর কাজ। বিচার বিভাগের নিম্নস্তরে ছিল আরো বিশৃংখলা। পাকিস্তানি দখলদারিত্বের সময় পাকিস্তানি সেনাদের বিভিন্ন দুস্কর্মপূর্ণ অভিযানে যেসব ম্যাজিস্ট্রেট উপস্থিত ছিলেন, প্রাথমিকভাবে দালাল আইনের অভিযুক্তদের তাদের আদালতেই উপস্থিত করা হতো। ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশসহ যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারি দখলদারিত্বের সময় চাকুরিরত ছিল, দেশমুক্ত হওয়ার পর তারাই ছিল মাঠ প্রশাসনের বড় অংশ। এরাও কোন না কোনভাবে সহযোগী ছিল বা সহযোগী হতে বাধ্য হয়েছিল পাকিস্তানি দখলদারিদের। আবার জনগণের মধ্যেও যারা দেশে ছিল, তারা অনেক সময় বাধ্য হয়ে সহযোগীতা করতে হয়েছে পাকিস্তানিদের । এমনও দেখা গেছে যে, যে ম্যাজিস্টেটের নেতৃত্বে পাকিস্তানিরা এদেশীয় সহযোগীদের নিয়ে কোন অপরাধমূলক কাজ করেছে, দালাল আইনে ঐ ঘটনায় অংশ নেয়ার জন্যে দেশীয় দালালদের ঐ একই সহযোগী ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে হাজির করা হয়েছে বিচারের জন্যে। দালাল আইনে বিচারের সময় এসব বাধা অতিক্রম করা ছিল অত্যন্ত কঠিন। এছাড়া দালাল আ্ইনে হাজার হাজার মামলা দায়ের হওয়ায়, ঐসব মামলা পরিচালনায় প্রয়োজনীয় লোকবলের অভাবও ছিল প্রকট, যার দরুণ অধিকাংশ মামলা প্রমাণাভাবে নিস্পত্তি লাভ করে। প্রকৃত দালালদের সাথে অনেক নীরিহ লোক এসব মামলায় জড়িয়ে পড়ে এবং দেশব্যাপী এক অস্থির পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এ অবস্থায় সাধারণ লোক যাতে ভোগান্তির শিকার না হয় বা পূর্ব শত্রুতার জন্যে প্রতিহিংসার শিকার না হয় সেজন্যে তদানিন্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বর খুন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও লুঠতরাজের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যতীত অন্যান্যদের প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর বাংলাদেশে কলাবরেটর (স্পেশাল ট্রাইবুনাল) (রিপিল) অর্ডিন্যান্স, ১৯৭৫ (অর্ডিন্যান্স নং এল এক্স ট্রিপল ওয়ান অব ১৯৭৫) জারি করে পাকিস্তানি দেশীয় দোসরদের বিচারে আ্ইন বাতিল করে।
এই সব যুদ্ধবন্দীদের বিচারের আওতায় আনার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে অভিযুক্ত যুদ্ধবন্দীদের হস্তান্তরের জন্যে ১৯৭২ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশ ভারতকে অনুরোধ জ্ঞাপন করে। তদুত্তরে ভারত নৃশংসতার প্রাথমিক অভিযোগ (প্রাইমাফেসি) আছে এমন যুদ্ধবন্দীদের বাংলাদেশের নিকট হস্তান্তর করতে রাজী হয় (India opens way for Dacca trials, The New York Times, March 18, 1972, Page 1)। সেই মোতাবেক বাংলাদেশ ভারতকে ১৫০ জন যুদ্ধবন্দীর বিরুদ্ধে প্রাথমিক প্রমাণ দাখিল করলে, তাদের বাংলাদেশের হেফাজতে দিতে রাজী হয় ভারত (India to Deliver 150 P.O.W.'s To Bangladesh to Face Trial, The New York Times, Jun 15, 1972, Page 11)।বিচার ঠেকাতে ভুট্টো ঘোষণা করেন যে পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে বাংলাদেশকে জাতিসংঘের সদস্যপদ হতে বাধা সৃষ্টি করবে পাকিস্তান। পরিণামে দেখা গেল বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য পদ চাইলে তা আটকে গেলো ১৯৭২ সালের ২৫ আগস্ট তারিখে পাকিস্তানের পক্ষ হয়ে গণচীনের প্রদত্ত ভেটোর কারণে (A Veto By Peking, The New York Times, Aug 27, 1972; pg. E3)।
ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর এবং বাংলাদেশ কমনওয়েলথের ৩২ তম সদস্যপদ লাভ করেছিল ১৯৭২ সালের ১৮ এপ্রিল। । কিন্তু যুদ্ধবন্দীদের নি:শর্ত মুক্তির কারণে পাকিস্তান কর্তৃক বাংলাদেশেকে স্বীকৃতি ও জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ দুস্কর হয়ে উঠে। নূতন রাস্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জাতিসংঘে আসনপ্রাপ্তি ছিল অত্যন্ত জরুরি। দেশের খাদ্য ঘাটতি মেটানো, উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা ছাড়াও বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাথে কুটনৈতিক, অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্যে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাড়ায় পাকিস্তানের ও জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করা। পাকিস্তানের স্বীকৃতি ব্যতীত তা লাভ করা ছিল প্রায় অসম্ভব। ১৯৭২ সালের জুলাই মাসে অনুষ্ঠিতব্য ভারত-পাকিস্তান শীর্ষ সন্মেলন সেই সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তুলে। তবে শীর্ষ বৈঠককে সামনে রেখে ১৯৭২ সালের ২৯ মার্চ নিয়াজি এবং রাও ফরমান আলীসহ ১১০০ পাকিস্তানি যুদ্ধপরাধীর বিচার করবে বলে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিক ঘোষণা প্রদান করে (নিউইয়র্ক টাইমস, ৩০ মার্চ ১৯৭২, পৃ ৩)। বাংলাদেশের এই হুমকী সিমলায় ভারত-পাকিস্তান শীর্ষ বৈঠকে ছায়াপাত ফেলতে পারেনি, যুদ্ধবন্দী পাকিস্তানী সৈন্যদের উল্লেখ ছাড়াই দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা পরিহার করে সৎপ্রতিবেশি সুলভ আচরণের অঙ্গীকারসহ ১৯৭২ সালের ২ জুলাই দ্বিপক্ষীয় সিমলা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
এই চুক্তি ভারত পাকিস্তানের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়াতে সহায়ক হয় এবং সেই সাথে সূযোগ সৃষ্টি হয় বাংলাদেশের স্বীকৃতির ব্যাপারে পরোক্ষ কূটনৈতিক আলোচনার। ঐ সময় বাংলাদেশের আরেক বড় সমস্যা ছিল পাকিস্তানে প্রায় বন্দী জীবনযাপনরত লক্ষাধিক বাঙালি সামরিক ও বেসামরিক লোকজনকে মুক্ত স্বদেশে ফিরিয়ে আনা। পাকিস্তানের সরকারও তখন প্রচন্ড চাপে ছিল যুদ্ধবন্দী ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়ে। সিমলা চুক্তির পর পাকিস্তান-ভারত দূতিয়ালী শুরু হয় ত্রিদেশীয় সমস্যা সমাধানের জন্যে। বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান, বাঙালিদের প্রত্যাবাসন, যুদ্ধবন্দীদের প্রত্যাবর্তন, অবাঙালিদের প্রত্যাবাসন, যুদ্ধপরাধের বিচারের বিষয় প্রাধান্য পায় ঐ সব আলোচনা।
উল্লেখ্য যে আত্মসমর্পন দলিল অনুযায়ী এই বিপুল সংখ্যক যুদ্ধ বন্দীদেরকে জেনেভা কনভেশনের সকল সুবিধা ছাড়াও তাদের নিরাপত্তা ও কল্যানের গ্যারান্টি দেয়া হয়েছিল। এদিকে বাংলাদেশের শরণার্থীরা দ্রুত স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করায় ভারতে বৈদেশিক ত্রাণ তৎপরতা বন্ধ হয়ে যায় এবং বিপুল যুদ্ধবন্দীদের কঠোর নিরাপত্তারর মধ্যে রাখা ও তাদের ভরণ-পোষণ, স্বাস্থ্য-সুরক্ষা দিতে ভারতের উপর বড় ধরণের চাপের উপদ্রব ঘটে। শিমলা চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধবন্দীর সুরাহা না হওয়ায় যুদ্ধবন্দী, পাকিস্তানে আটক লক্ষাধিক বাঙালি, বাংলাদেশে আটক অবাঙালির মুক্তি ও প্রত্যাবাসনসহ বাংলাদেশের স্বীকৃতি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় ভুট্টো ঘোষণা প্রদান করে যে পাকিস্তানের স্বার্থ বিকিয়ে যুদ্ধবন্দীদেরকে মুক্ত করা হবেনা। পাকিস্তানের এই অনমনীয়তার প্রেক্ষিতে ভারত বাংলাদেশের সম্মতি নিয়ে পাকিস্তানের সাথে বিভিন্ন প্রস্তাব চালাচালি করে। তন্মধ্যে একটি প্রস্তাব ছিল ১৯৭৩ সালের মার্চ মাসে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের নিয়ে একটি বিশেষ ট্রাইবুনাল গঠন করে যুদ্ধপরাধের বিশেষত: গণহত্যা, খুন, জেনেভা কনভেনশনের ৩ নং আর্টিকেল অমান্যসহ ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লটতরাজের অভিযোগে অভিযুক্ত ১৯৫ জন পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দীর আন্তর্জাতিক মানের বিচার অনুষ্ঠিত করা। প্রস্তাবে বলা হয় যে, বিচারের সময় আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন আইনজ্ঞগণ পর্যবেক্ষক হিসেবে উপস্থিত থাকবেন এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্যে অভিযুক্তরা ইচ্ছেমতো দেশি বা বিদেশি আইনজীবি নিয়োগ দিতে পারবেন। ভারতের এই প্রস্তাব ৪র্থ জেনেভা কনভেনশন-এর আর্টিকেল ৩(১) (ডি)এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল। জেনভা কনভেনশনের এই আর্টিকেলে যুদ্ধবন্দীদের বিচারের প্রসঙ্গে শর্ত ছিল যে অভিযুক্ত যুদ্ধবন্দিদের বিচারের জন্য সভ্যজাতিসমূহের স্বীকৃত বিচারিক সুবিধাদি প্রদানের নিশ্চিত করার মাধ্যমে নিয়মসম্মতভাবে গঠিত আদালতের রায় দ্বারা তাদের বিচার ও রায় কার্যকর করা যাবে। এর প্রত্তুত্যরে ১৯৭৩ সালের ২৭ মে, ভুট্টো নিজ দেশে আটক ২০৩ জন সিনিয়র বাঙালি কর্মকর্তাদেরক গোয়েন্দাগিরির অভিযোগে একই ধরণের আদালতে বিচার করা হবে বলে হুমকি প্রদান করেন ( Bhutto Threatens to Try Bengalis Held in Pakistan, The New York Times, May 29, 1973; pg. 3)। কিন্তু এ হুমকি মাথায় নিয়েও বাংলাদেশ পাকিস্তানি যুদ্ধপরাধীদের বিচারের জন্যে ১৯৭৩ সালের ২০ জুলাই বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনাল) আইন ১৯৭৩ প্রণয়ন করে। এ আইন যাতে সাংঘর্ষিক না হয়, তজ্জন্য ১৯৭৩ সালের ১৫ জুলাই তারিখে প্রথম বারের মতো পরিবর্তন আনা হয় সংবিধানে। এই সংশোধনী (The Constitution (First Amendment) Act, 1973) দ্বারা সংবিধানের অনুচ্ছেদ নং ৪৭-এ একটি অতিরিক্ত ক্লজ সংযুক্তির দ্বারা গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধপরাধসহ অন্যান্য অপরাধের বিচারের পথ সুগম করা হয় এবং ৪৭(ক) নামে একটি নূতন অ্নুচ্ছেদ সংযোজন দ্বারা এইসব বিচারের ক্ষেত্রে বিচারাধীণ অভিযুক্তদের মৌলিক অধিকার সীমিত করা হয়।
এই চুক্তির মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান উভয়ের সূযোগ আসে পারস্পরিক সমস্যাসমূহ বিদূরিত করার। এই চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তসমূহ ছিল: ১, যুদ্ধপরাধের জন্য অভিযুক্ত ১৯৫ জন পাকিস্তানী সৈন্য বতীত সকল যুদ্ধবন্দীর মুক্তিদান, ২. পাকিস্তানে আটক সকল বাঙালির প্রত্যাবাসন, ৩. বিহারিদের একটি অংশ পাকিস্তানে প্রত্যাবাসন, ৪. বিহারি ও যুদ্ধপরাধে অভিযুক্ত পাকিস্তানি সৈন্যদের মুক্তির আলোচনায় বাংলাদেশকে সমমর্যাদা অর্থাৎ স্বীকৃতি প্রাপ্ত রাস্ট্রের মর্যাদায় অংশগ্রহণের প্রতিশ্রুতি।
১৯৭৪ সালের ২২-২৪ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান লাহোরে ইসলামিক দেশসমূহের সংস্থার (ওআইসি) শীর্ষ বৈঠকের আয়োজন করে । ওআইসিভুক্ত মুসলিম দেশগুলোর একান্ত ইচ্ছা ছিল যে ঐ শীর্ষ সন্মেলনে বাংলাদেশও যোগদান করুক। সে ইচ্ছার প্রতি সম্মান দেখিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেন যে পাকিস্তান কর্তৃক বাংলাদেশকে স্বাধীন সার্বভৌম রাস্ট্রের স্বীকৃতি ব্যতীত তার পক্ষে ঐ সন্মেলনে যোগদান করা সম্ভব নয়। পক্ষান্তরে ভুট্টো ঘোষণা করেন যে, যুদ্ধপরাধের দায়ে আটক ১৯৫ জন যুদ্ধবন্দীর মুক্তি না দিলে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়া সম্ভব নয়। এই সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ-পাকিস্তানের বিরাজমান সমস্যা নিয়ে আলোচনার জন্যে ২১ ফেব্রুয়ারি ৩৭টি মুসলিম দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রীবৃন্দ এক বৈঠকে মিলিত হন এবং ৭ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল ঢাকায় আসে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে আলোচনার জন্যে (নিউয়র্ক টাইমস ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪: Islamic Mission to Dacca Seeks Bengali-Pakistani Reconciliation; গার্ডিয়ান ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪: Last attempt to coax Mujib)। এ পরিস্থিতিতে পাকিস্তান কর্তৃক কূটনৈতিক স্বীকৃতি, জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ, আটক বাঙালিদের মুক্তি এবং পাকিস্তানের সাথে বিরোধ মিটিয়ে ফেলে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্যে পাকিস্তানি যুদ্ধপরাধীদের মুক্তি দিতে সম্মত হন শেখ মুজিব। ফলে ১৯৭৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান বাংলাদেশকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি জ্ঞাপন করে। কূটনৈতিক স্বীকৃতি ও যুদ্ধবন্দীদের মুক্তিতে ঐক্যমত হওয়ায় পরবর্তী বিষয়গুলোর সমাধানের জন্য কুটনৈতিক তৎপরতা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এর ধারাবাহিকতায় দিল্লীতে অনুষ্ঠিত হয় ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক। বৈঠক শেষে ৯ এপ্রিল ১৯৭৪ সালে একটি ত্রিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার মধ্যে ছিল ১.সিমলা চুক্তির প্রতি সমর্থন, ২. ১৯৭৩ সালের ১৭ এপ্রিল তারিখে ভারত-পাকিস্তান চুক্তির প্রতি সমর্থন, ৩. যুদ্ধপরাধে অভিযু্ক্ত সেনারা অপরাধ করে থাকলে তজ্জন্য পাকিস্তানি পররাষ্ট্র মন্ত্রীর দু:খ প্রকাশ, ৪. পাকিস্তানি প্র্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশের জনগণের প্রতি অতীতের ভুল ভুলে গিয়ে ক্ষমার আবেদনের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ১৯৫ জন য়ুদ্ধপরাধীকে ক্ষমা (act of clemency) করার ঘোষণা। চুক্তিতে একথাও উল্লেখ করা হয় যে,
২২ ডিসেম্বর ১৯৭১ অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের ঢাকা আগমণ।
২৪ জানুয়ারি ১৯৭২ বাংলাদেশ কলাবরেটর (স্পেশাল ট্রাইবুনাল) আইন, ১৯৭২ জারি।
০৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ ২৫ বছর মেয়াদী ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষর।
১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন।
১৭ মার্চ ১৯৭২ ভারতীয় বাহিনীর বাংলাদেশ ত্যাগ।
২৯ মার্চ ১৯৭২ পাকিস্তানি ১১০০ যুদ্ধবন্দীর যুদ্ধপরাধে বিচারের সম্মুখীন করার ঘোষণা।
০২ জুলাই ১৯৭২ সিমলা চুক্তি স্বাক্ষর।
০৪ নভেম্বর ১৯৭২ গণপরিষদে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন।
১৬ ডিসেম্বর ১৯৭২ বাংলাদেশের সংবিধান কার্যকর।
০৭ মার্চ ১৯৭৩ ১ম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান।
২০ জুলাই ১৯৭৩ আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনাল) আইন, ১৯৭৩ প্রণয়ন।
২৮ আগস্ট ১৯৭৩ পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে দিল্লী চুক্তি সম্পাদন।
০৬ সেপ্টেম্বর ১৯৭৩ জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনে যোগদান।
৩০ নভেম্বর ১৯৭৩ শর্তসাপেক্ষ দালাল আইনে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা।
২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪ ওআইসিভুক্ত ৭ সদস্যের ঢাকা আগমণ ও শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে আলোচনা।
২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪ পাকিস্তান কর্তৃক বাংলাদেশকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি দান।
০৯ এপ্রিল ১৯৭৪ দিল্লীতে ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তান ত্রিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষর।
১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ বাংলাদেশের জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ।
মাত্র ৯ মাসের মধ্যে বাংলাদেশ শত্রুমুক্ত হলেও, বাঙালি জাতিকে এর জন্যে চরম মূল্য দিতে হয়েছে। দখলদারিত্বের সময় পাকিস্তানি সৈন্যরা বাংলাদেশের সর্বত্র হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে, শিশু,যুবা, নারী, বৃদ্ধ কেউ তাদের হাত থেকে রেহাই পায়নি। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাড়খার করেছে, গ্রাম শুদ্ধ লোকজনকে হত্যা করেছে পালানোর পথ বন্ধ করে। হত্যার সাথে সাথে তারা হাজার হাজার যুবতি, কিশোরিকে ধর্ষন করেছে, ব্যাংকারে পর্যন্ত বহু নারীকে আটকে রে্খে ধর্ষণ করেছে দিনের পর দিন। সাধারণ সৈনিক থেকে সেনাপতি নিয়াজি পর্যন্ত সবাই এই জঘন্য কাজে অংশ নিয়েছে। পাকিস্তানিদের অত্যাচার উৎপীড়ণে প্রায় ১ কোটি লোক শরণার্থী হয়ে আশ্রয় নিয়েছে ভারতে। পাকিস্তানিদের এই সব জঘন্য কাজে মদদ দিয়েছে শান্তি কমিটির লোকজন, সাহায্য সহযোগীতা করেছে বিভিন্ন নামের বাহিনীগুলো। সহযোগীতা করেই তারা ক্ষান্ত হয়নি, নিজেরাও পাকিস্তানি সৈন্যদের মতো খুন, ধর্ষণ, অগ্রিসংযোগ, লুন্ঠনসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে অংশ নিয়েছে। শত্রুমুক্ত হওয়ার প্রাক্কালে দেশের বরেণ্য বুদ্ধিজীবিদেরকে হত্যার সাথে রাজাকার, আল-শামস, আল-বদর বাহিনীর সম্পৃক্ততা তাদেরকে দেশের মানুষের কাছে চরম ঘৃণার পাত্র হিসেবে পরিগণিত তুলে এবং অদ্যাবধি এই ঘৃণা আগের প্রজন্ম থেকে বর্তমান প্রজন্মে সঞ্চারিত হয়েছে।
দেশ শত্রুমুক্ত হওয়ার পর জনগণ সোচ্চার হয়ে উঠে পাকিস্তানি সৈন্যদের ও তাদের সহযোগীদের বিচারের দাবিতে। বাংলাদেশ সরকারের তদানিন্তন প্রধানমন্ত্রী ও অবিসংবাদী নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানের বন্দীত্ব ঘুচিয়ে দেশে ফেরার পর আমেরিকান ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন বা এবিসি-এর প্রতিবেদকের নিকট এই বলে মন্তব্য করেন যে, আমি অবশ্য তাদের বিচার করব। কোন দেশ কি ৩০ লক্ষ লোকের হত্যাকারিদের (বিনা বিচারে) মুক্তি দিতে পারে? (“I will definitely put them on trial. Can any country free those who have killed three million people?”)
দালাল আইন প্রণয়ন:
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি দথলদার সৈন্যদের আত্মসমর্পনের পর ২২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকার ফিরে আসে ঢাকায়। হাজার হাজার সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধা, ভারতে আশ্রয় নেয়া রাজনীতিবিদ, লক্ষ লক্ষ শরণার্থী ফেরত আসতে শুরু করে ঐ সময়। এরা সবাই ছিল পাকিস্তানি হানাদারদের দোসর দ্বারা নির্যাতিত। পাকিস্তানি সৈন্যরা আত্মসমর্পনের মাধ্যমে বন্দীত্ব ও বন্দীত্ব অবস্থায় জেনেভা কনভেশনদ্বারা সুরক্ষিত থাকলেও, পাকিস্তানের দোসর দেশীয় দালালদের কোন নিরাপত্তা ছিল না। দথলদারিত্বের সময় তাদের ঘৃন্য কার্যকলাপের জন্যে তারা ছিল জনগণের চোখে দেশ ও দশের পরম শত্রু। স্বভাবত:ই তারা নিক্ষিপ্ত হয় জনগণের, সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাদের রোষানলে।![]() |
| ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে ঢাকায় কাদের সিদ্দিকী কর্তৃক রাজাকার নিধনের দৃশ্য |
পাকিস্তানিদের সহযোগী শান্তি কমিটির সদস্যদের মধ্যে যারা ছিল সঙ্গতিপূর্ণ তাদের অনেকেই তখন নিরাপত্তার জন্যে গ্রাম ছেড়ে আত্মগোপন করে ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে, অনেকে চলে যায় বিদেশ। আল-বদর, আল-শামসের সদস্যরাও গা ঢাকা দেয়। প্রাণ বাচানোর জন্যে তখন অনেক দালাল আশ্রয় নেয় স্বেচ্ছাকারাবাসের, কেউ কেউ আশ্রয় নেয় মুক্তিযোদ্ধা আত্মীয়-স্বজনদের নিরাপত্তার। একটি প্রবাসী সরকার দেশে এসেই শান্তি-শৃংখলা স্থাপন করবে এমন আশাকরা যায় না। সেজন্যে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার দেশ শত্রুমুক্ত হওয়ার মাত্র ৪০ দিনের মধ্যে পাকিস্তানিদের দেশীয় দোসর বা দালালদের হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ইত্যাদি অপরাধের বিচারের জন্যে ২৪ জানুয়ারি বাংলাদেশ কলাবরেটরস (স্পেশাল ট্রাইবুনাল) আইন, ১৯৭২ (The Bangladesh Collaborators (Special Tribunal) Act, 1972) প্রণয়ন করে।
দালালদের প্রতি সাধারণ ক্ষমা:
দালাল আইনে প্রায় ৩৭ হাজার লোক গ্রেপ্তার হয়। ফলে প্রাথমিকভাবে পাকিস্তানের সহযোগীরা আইনের আশ্রয় পাওয়ায় তারা প্রতিহিংসার আগুণ থেকে রক্ষা পায়। সাধারণ জনগণ ও মুক্তিযোদ্ধারাও এই ভেবে কিছুটা শান্তিলাভ করেন যে দালালদের বিচার হবে এবং তারা যথাযথ শাস্থি লাভ করবে। কিন্তু এই আইনের প্রাথমিক উদ্দেশ্য সফল হলেও দালালদেরকে বিচার করে শাস্থি প্রদান কঠিন হয়ে পড়ে নানা কারনে। ১৯৭৩ সালের অক্টোবর মাস অবধি এদের মধ্যে ২ হাজার ৮ শত ৪৮টি মামলার বিচার অনুষ্ঠিত হয় এবং দন্ডিত হয় মাত্র ৭৫২ জন। দি গার্ডিয়ানের ১৯৭২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর উল্লেখ করে যে, পাকিস্তানিদের দালাল হিসেবে প্রায় ৩২ হাজার লোককে গ্রেপ্তার করা হলেও ২০ হাজার লোকের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। কিন্তু সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাবে বাকি লোকদের বিচার ঝুলতে থাকে। গার্ডিয়ান Bangladesh purge of ‘collaborators” শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদে আরো উল্লেখ করে যে, প্রচলিত আইনে গণহত্যা প্রমাণের জন্যে প্রয়োজনীয় পোস্ট মর্টেম রিপোর্টসহ অন্যান্য প্রমাণের অনুপস্থিতি, দালালদের বিরোধী দলের আশ্রয় গ্রহণ বিচারের পথে অন্তরায় হয়ে দাড়ায়। গার্ডিয়ান ১৯৭২ সালের ১ ডিসেম্বর Trials of error শীর্ষক প্রতিবেদনে জানায় যে কিছু সুযোগ সন্ধানীব্যাক্তি তাদের পূর্বশত্রুতা চরিতার্থ করার জন্যে নীরিহ লোকজনকেও জড়িয়ে দিচ্ছে দালাল আইনের মামলায়।
প্রসঙ্গত উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, স্বাধীনতার প্রথম প্রহরে সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ৯ মাসের অকার্যকারিতাকে অতিক্রম করে স্বাভাবিক কাজকর্মের ছন্দে ফিরিয়ে আনা ছিল দুস্কর কাজ। বিচার বিভাগের নিম্নস্তরে ছিল আরো বিশৃংখলা। পাকিস্তানি দখলদারিত্বের সময় পাকিস্তানি সেনাদের বিভিন্ন দুস্কর্মপূর্ণ অভিযানে যেসব ম্যাজিস্ট্রেট উপস্থিত ছিলেন, প্রাথমিকভাবে দালাল আইনের অভিযুক্তদের তাদের আদালতেই উপস্থিত করা হতো। ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশসহ যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারি দখলদারিত্বের সময় চাকুরিরত ছিল, দেশমুক্ত হওয়ার পর তারাই ছিল মাঠ প্রশাসনের বড় অংশ। এরাও কোন না কোনভাবে সহযোগী ছিল বা সহযোগী হতে বাধ্য হয়েছিল পাকিস্তানি দখলদারিদের। আবার জনগণের মধ্যেও যারা দেশে ছিল, তারা অনেক সময় বাধ্য হয়ে সহযোগীতা করতে হয়েছে পাকিস্তানিদের । এমনও দেখা গেছে যে, যে ম্যাজিস্টেটের নেতৃত্বে পাকিস্তানিরা এদেশীয় সহযোগীদের নিয়ে কোন অপরাধমূলক কাজ করেছে, দালাল আইনে ঐ ঘটনায় অংশ নেয়ার জন্যে দেশীয় দালালদের ঐ একই সহযোগী ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে হাজির করা হয়েছে বিচারের জন্যে। দালাল আইনে বিচারের সময় এসব বাধা অতিক্রম করা ছিল অত্যন্ত কঠিন। এছাড়া দালাল আ্ইনে হাজার হাজার মামলা দায়ের হওয়ায়, ঐসব মামলা পরিচালনায় প্রয়োজনীয় লোকবলের অভাবও ছিল প্রকট, যার দরুণ অধিকাংশ মামলা প্রমাণাভাবে নিস্পত্তি লাভ করে। প্রকৃত দালালদের সাথে অনেক নীরিহ লোক এসব মামলায় জড়িয়ে পড়ে এবং দেশব্যাপী এক অস্থির পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এ অবস্থায় সাধারণ লোক যাতে ভোগান্তির শিকার না হয় বা পূর্ব শত্রুতার জন্যে প্রতিহিংসার শিকার না হয় সেজন্যে তদানিন্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বর খুন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও লুঠতরাজের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যতীত অন্যান্যদের প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর বাংলাদেশে কলাবরেটর (স্পেশাল ট্রাইবুনাল) (রিপিল) অর্ডিন্যান্স, ১৯৭৫ (অর্ডিন্যান্স নং এল এক্স ট্রিপল ওয়ান অব ১৯৭৫) জারি করে পাকিস্তানি দেশীয় দোসরদের বিচারে আ্ইন বাতিল করে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনাল) আইন ১৯৭৩:
পক্ষান্তরে পাকিস্তানি বন্দী সৈন্যদের মধ্য থেকে যুদ্ধপরাধের বিচারের ব্যবস্থা নানা কারণে বিলম্বিত হয়। হামদুর রহমান কমিশনের প্রতিবেদন মোতাবেক পাকিস্তানের যুদ্ধবন্দীর মোট সংখ্যা ছিল ৯০ হাজার ৩ শত ৬৮ জন, যার মধ্যে স্থল বাহিনীর ৫৪ হাজার ১ শত ৫৪ জন, নৌবাহিনীর ১ হাজার ৩ শত ৮১ জন, বিমান বাহিনীর ৮ শত ৩৩ জন, পুলিশসহ প্যারামিলিটারির ২২ হাজার জন, বেসামরিক ১২ হাজার লোক ছিল। বাংলাদেশ জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃত রাষ্ট্র না হওয়ায়, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরে স্বাক্ষরিত আত্মসমর্পনের দলিল ও জাতিসংঘ কর্তৃক ২১ ডিসেম্বর তারিখে গৃহীত ৩০৭ (১৯৭১) নম্বর রেজুলেশন মোতাবেক জেনেভা কনভেনশন ১৯৪৯-এর আওতায় প্রায় ১ সপ্তাহের মধ্যে সকল যুদ্ধবন্দীকে নিয়ে যাওয়া হয় ভারতে।![]() |
| পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দীর দল |
এই সব যুদ্ধবন্দীদের বিচারের আওতায় আনার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে অভিযুক্ত যুদ্ধবন্দীদের হস্তান্তরের জন্যে ১৯৭২ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশ ভারতকে অনুরোধ জ্ঞাপন করে। তদুত্তরে ভারত নৃশংসতার প্রাথমিক অভিযোগ (প্রাইমাফেসি) আছে এমন যুদ্ধবন্দীদের বাংলাদেশের নিকট হস্তান্তর করতে রাজী হয় (India opens way for Dacca trials, The New York Times, March 18, 1972, Page 1)। সেই মোতাবেক বাংলাদেশ ভারতকে ১৫০ জন যুদ্ধবন্দীর বিরুদ্ধে প্রাথমিক প্রমাণ দাখিল করলে, তাদের বাংলাদেশের হেফাজতে দিতে রাজী হয় ভারত (India to Deliver 150 P.O.W.'s To Bangladesh to Face Trial, The New York Times, Jun 15, 1972, Page 11)।বিচার ঠেকাতে ভুট্টো ঘোষণা করেন যে পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে বাংলাদেশকে জাতিসংঘের সদস্যপদ হতে বাধা সৃষ্টি করবে পাকিস্তান। পরিণামে দেখা গেল বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য পদ চাইলে তা আটকে গেলো ১৯৭২ সালের ২৫ আগস্ট তারিখে পাকিস্তানের পক্ষ হয়ে গণচীনের প্রদত্ত ভেটোর কারণে (A Veto By Peking, The New York Times, Aug 27, 1972; pg. E3)।
![]() |
| ভুট্টো মাও সে তুং-এর সাথে |
ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর এবং বাংলাদেশ কমনওয়েলথের ৩২ তম সদস্যপদ লাভ করেছিল ১৯৭২ সালের ১৮ এপ্রিল। । কিন্তু যুদ্ধবন্দীদের নি:শর্ত মুক্তির কারণে পাকিস্তান কর্তৃক বাংলাদেশেকে স্বীকৃতি ও জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ দুস্কর হয়ে উঠে। নূতন রাস্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জাতিসংঘে আসনপ্রাপ্তি ছিল অত্যন্ত জরুরি। দেশের খাদ্য ঘাটতি মেটানো, উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা ছাড়াও বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাথে কুটনৈতিক, অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্যে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাড়ায় পাকিস্তানের ও জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করা। পাকিস্তানের স্বীকৃতি ব্যতীত তা লাভ করা ছিল প্রায় অসম্ভব। ১৯৭২ সালের জুলাই মাসে অনুষ্ঠিতব্য ভারত-পাকিস্তান শীর্ষ সন্মেলন সেই সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তুলে। তবে শীর্ষ বৈঠককে সামনে রেখে ১৯৭২ সালের ২৯ মার্চ নিয়াজি এবং রাও ফরমান আলীসহ ১১০০ পাকিস্তানি যুদ্ধপরাধীর বিচার করবে বলে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিক ঘোষণা প্রদান করে (নিউইয়র্ক টাইমস, ৩০ মার্চ ১৯৭২, পৃ ৩)। বাংলাদেশের এই হুমকী সিমলায় ভারত-পাকিস্তান শীর্ষ বৈঠকে ছায়াপাত ফেলতে পারেনি, যুদ্ধবন্দী পাকিস্তানী সৈন্যদের উল্লেখ ছাড়াই দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা পরিহার করে সৎপ্রতিবেশি সুলভ আচরণের অঙ্গীকারসহ ১৯৭২ সালের ২ জুলাই দ্বিপক্ষীয় সিমলা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
![]() |
| সিমলা বৈঠকে চুক্তি স্বাক্ষররত ভুট্টো ও ইন্দিরা গান্ধী |
এই চুক্তি ভারত পাকিস্তানের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়াতে সহায়ক হয় এবং সেই সাথে সূযোগ সৃষ্টি হয় বাংলাদেশের স্বীকৃতির ব্যাপারে পরোক্ষ কূটনৈতিক আলোচনার। ঐ সময় বাংলাদেশের আরেক বড় সমস্যা ছিল পাকিস্তানে প্রায় বন্দী জীবনযাপনরত লক্ষাধিক বাঙালি সামরিক ও বেসামরিক লোকজনকে মুক্ত স্বদেশে ফিরিয়ে আনা। পাকিস্তানের সরকারও তখন প্রচন্ড চাপে ছিল যুদ্ধবন্দী ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়ে। সিমলা চুক্তির পর পাকিস্তান-ভারত দূতিয়ালী শুরু হয় ত্রিদেশীয় সমস্যা সমাধানের জন্যে। বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান, বাঙালিদের প্রত্যাবাসন, যুদ্ধবন্দীদের প্রত্যাবর্তন, অবাঙালিদের প্রত্যাবাসন, যুদ্ধপরাধের বিচারের বিষয় প্রাধান্য পায় ঐ সব আলোচনা।
উল্লেখ্য যে আত্মসমর্পন দলিল অনুযায়ী এই বিপুল সংখ্যক যুদ্ধ বন্দীদেরকে জেনেভা কনভেশনের সকল সুবিধা ছাড়াও তাদের নিরাপত্তা ও কল্যানের গ্যারান্টি দেয়া হয়েছিল। এদিকে বাংলাদেশের শরণার্থীরা দ্রুত স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করায় ভারতে বৈদেশিক ত্রাণ তৎপরতা বন্ধ হয়ে যায় এবং বিপুল যুদ্ধবন্দীদের কঠোর নিরাপত্তারর মধ্যে রাখা ও তাদের ভরণ-পোষণ, স্বাস্থ্য-সুরক্ষা দিতে ভারতের উপর বড় ধরণের চাপের উপদ্রব ঘটে। শিমলা চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধবন্দীর সুরাহা না হওয়ায় যুদ্ধবন্দী, পাকিস্তানে আটক লক্ষাধিক বাঙালি, বাংলাদেশে আটক অবাঙালির মুক্তি ও প্রত্যাবাসনসহ বাংলাদেশের স্বীকৃতি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় ভুট্টো ঘোষণা প্রদান করে যে পাকিস্তানের স্বার্থ বিকিয়ে যুদ্ধবন্দীদেরকে মুক্ত করা হবেনা। পাকিস্তানের এই অনমনীয়তার প্রেক্ষিতে ভারত বাংলাদেশের সম্মতি নিয়ে পাকিস্তানের সাথে বিভিন্ন প্রস্তাব চালাচালি করে। তন্মধ্যে একটি প্রস্তাব ছিল ১৯৭৩ সালের মার্চ মাসে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের নিয়ে একটি বিশেষ ট্রাইবুনাল গঠন করে যুদ্ধপরাধের বিশেষত: গণহত্যা, খুন, জেনেভা কনভেনশনের ৩ নং আর্টিকেল অমান্যসহ ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লটতরাজের অভিযোগে অভিযুক্ত ১৯৫ জন পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দীর আন্তর্জাতিক মানের বিচার অনুষ্ঠিত করা। প্রস্তাবে বলা হয় যে, বিচারের সময় আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন আইনজ্ঞগণ পর্যবেক্ষক হিসেবে উপস্থিত থাকবেন এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্যে অভিযুক্তরা ইচ্ছেমতো দেশি বা বিদেশি আইনজীবি নিয়োগ দিতে পারবেন। ভারতের এই প্রস্তাব ৪র্থ জেনেভা কনভেনশন-এর আর্টিকেল ৩(১) (ডি)এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল। জেনভা কনভেনশনের এই আর্টিকেলে যুদ্ধবন্দীদের বিচারের প্রসঙ্গে শর্ত ছিল যে অভিযুক্ত যুদ্ধবন্দিদের বিচারের জন্য সভ্যজাতিসমূহের স্বীকৃত বিচারিক সুবিধাদি প্রদানের নিশ্চিত করার মাধ্যমে নিয়মসম্মতভাবে গঠিত আদালতের রায় দ্বারা তাদের বিচার ও রায় কার্যকর করা যাবে। এর প্রত্তুত্যরে ১৯৭৩ সালের ২৭ মে, ভুট্টো নিজ দেশে আটক ২০৩ জন সিনিয়র বাঙালি কর্মকর্তাদেরক গোয়েন্দাগিরির অভিযোগে একই ধরণের আদালতে বিচার করা হবে বলে হুমকি প্রদান করেন ( Bhutto Threatens to Try Bengalis Held in Pakistan, The New York Times, May 29, 1973; pg. 3)। কিন্তু এ হুমকি মাথায় নিয়েও বাংলাদেশ পাকিস্তানি যুদ্ধপরাধীদের বিচারের জন্যে ১৯৭৩ সালের ২০ জুলাই বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনাল) আইন ১৯৭৩ প্রণয়ন করে। এ আইন যাতে সাংঘর্ষিক না হয়, তজ্জন্য ১৯৭৩ সালের ১৫ জুলাই তারিখে প্রথম বারের মতো পরিবর্তন আনা হয় সংবিধানে। এই সংশোধনী (The Constitution (First Amendment) Act, 1973) দ্বারা সংবিধানের অনুচ্ছেদ নং ৪৭-এ একটি অতিরিক্ত ক্লজ সংযুক্তির দ্বারা গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধপরাধসহ অন্যান্য অপরাধের বিচারের পথ সুগম করা হয় এবং ৪৭(ক) নামে একটি নূতন অ্নুচ্ছেদ সংযোজন দ্বারা এইসব বিচারের ক্ষেত্রে বিচারাধীণ অভিযুক্তদের মৌলিক অধিকার সীমিত করা হয়।
স্বীকৃতি ও অভিযুক্ত যুদ্ধবন্দীদের মুক্তি
এই আইন জারির মাধ্যমে বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানসহ আটক বাঙালিদের প্রত্যাবাসনে রাজী হতে প্রবল চাপে পড়ে পাকিস্তান। এ সময় ভারত যাতে যুদ্ধপরাধর অভিযুক্তদের বাংলাদেশের হাতে তুলে না দেয় সেজন্যে ভুট্টো ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসে মামলা দায়ের করেন (দেখুন: India's Wars Since Independence, Maj Gen Sukhwant Singh AVSM,, Lancer International, USA, P 536-38)। এরূপ ব্যবস্থা-পাল্টা ব্যবস্থার ধারাবাহিক ঘটনাবলীর মাঝে বাংলাদেশের সমর্থনে ১৯৭৩ সালের ২৮ আগস্ট ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ দিল্লি চুক্তি সম্পাদিত হয়।এই চুক্তি স্বাক্ষর করেন তিন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীবৃন্দ: ড.কামাল হোসেন, শরণ সিং এবং আজিজ আহমেদ।![]() |
| ত্রিপক্ষীয় চুক্তিতে স্বাক্ষরের পর ড. কামাল হোসেন, শরণ সিং ও আজিজ আহমদ |
এই চুক্তির মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান উভয়ের সূযোগ আসে পারস্পরিক সমস্যাসমূহ বিদূরিত করার। এই চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তসমূহ ছিল: ১, যুদ্ধপরাধের জন্য অভিযুক্ত ১৯৫ জন পাকিস্তানী সৈন্য বতীত সকল যুদ্ধবন্দীর মুক্তিদান, ২. পাকিস্তানে আটক সকল বাঙালির প্রত্যাবাসন, ৩. বিহারিদের একটি অংশ পাকিস্তানে প্রত্যাবাসন, ৪. বিহারি ও যুদ্ধপরাধে অভিযুক্ত পাকিস্তানি সৈন্যদের মুক্তির আলোচনায় বাংলাদেশকে সমমর্যাদা অর্থাৎ স্বীকৃতি প্রাপ্ত রাস্ট্রের মর্যাদায় অংশগ্রহণের প্রতিশ্রুতি।
১৯৭৪ সালের ২২-২৪ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান লাহোরে ইসলামিক দেশসমূহের সংস্থার (ওআইসি) শীর্ষ বৈঠকের আয়োজন করে । ওআইসিভুক্ত মুসলিম দেশগুলোর একান্ত ইচ্ছা ছিল যে ঐ শীর্ষ সন্মেলনে বাংলাদেশও যোগদান করুক। সে ইচ্ছার প্রতি সম্মান দেখিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেন যে পাকিস্তান কর্তৃক বাংলাদেশকে স্বাধীন সার্বভৌম রাস্ট্রের স্বীকৃতি ব্যতীত তার পক্ষে ঐ সন্মেলনে যোগদান করা সম্ভব নয়। পক্ষান্তরে ভুট্টো ঘোষণা করেন যে, যুদ্ধপরাধের দায়ে আটক ১৯৫ জন যুদ্ধবন্দীর মুক্তি না দিলে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়া সম্ভব নয়। এই সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ-পাকিস্তানের বিরাজমান সমস্যা নিয়ে আলোচনার জন্যে ২১ ফেব্রুয়ারি ৩৭টি মুসলিম দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রীবৃন্দ এক বৈঠকে মিলিত হন এবং ৭ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল ঢাকায় আসে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে আলোচনার জন্যে (নিউয়র্ক টাইমস ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪: Islamic Mission to Dacca Seeks Bengali-Pakistani Reconciliation; গার্ডিয়ান ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪: Last attempt to coax Mujib)। এ পরিস্থিতিতে পাকিস্তান কর্তৃক কূটনৈতিক স্বীকৃতি, জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ, আটক বাঙালিদের মুক্তি এবং পাকিস্তানের সাথে বিরোধ মিটিয়ে ফেলে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্যে পাকিস্তানি যুদ্ধপরাধীদের মুক্তি দিতে সম্মত হন শেখ মুজিব। ফলে ১৯৭৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান বাংলাদেশকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি জ্ঞাপন করে। কূটনৈতিক স্বীকৃতি ও যুদ্ধবন্দীদের মুক্তিতে ঐক্যমত হওয়ায় পরবর্তী বিষয়গুলোর সমাধানের জন্য কুটনৈতিক তৎপরতা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এর ধারাবাহিকতায় দিল্লীতে অনুষ্ঠিত হয় ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক। বৈঠক শেষে ৯ এপ্রিল ১৯৭৪ সালে একটি ত্রিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার মধ্যে ছিল ১.সিমলা চুক্তির প্রতি সমর্থন, ২. ১৯৭৩ সালের ১৭ এপ্রিল তারিখে ভারত-পাকিস্তান চুক্তির প্রতি সমর্থন, ৩. যুদ্ধপরাধে অভিযু্ক্ত সেনারা অপরাধ করে থাকলে তজ্জন্য পাকিস্তানি পররাষ্ট্র মন্ত্রীর দু:খ প্রকাশ, ৪. পাকিস্তানি প্র্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশের জনগণের প্রতি অতীতের ভুল ভুলে গিয়ে ক্ষমার আবেদনের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ১৯৫ জন য়ুদ্ধপরাধীকে ক্ষমা (act of clemency) করার ঘোষণা। চুক্তিতে একথাও উল্লেখ করা হয় যে,
"the Prime Minister of Pakistan had declared that he would visit Bangladesh in response to the invitation of the Prime Minister of Bangladesh and appealed to the people of Bangladesh to forgive and forget the mistakes of the past in order to promote reconciliation. Similarly, the Prime Minister of Bangladesh had declared with regard to the atrocities and destruction committed in Bangladesh in 1971, that he wanted the people to forget the past and to make a fresh start, stating that the people of Bangladesh knew how to forgive."ত্রিপক্ষীয় এই শর্তহীন চুক্তির ফলে যুদ্ধপরাধের অভিযোগে আটক পাকিস্তানি সৈন্যদের বিচার চিরদিনের জন্য রুদ্ধ হয়ে যায়। পাকিস্তানি যুদ্ধপরাধীদের ছেড়ে দেওয়ার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি সহজ হয়ে উঠে। ফলশ্রুতিতে নিরাপত্তা পরিষদের সুপারিশক্রমে আমেরিকা, পাকিস্তান ও চীনের সমর্থনে বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে ১৯৭৪ সালের সেপ্টেম্বরের ১৭ তা্রিখে। এই সমর্থন ও স্বীকৃতি ছিল স্বাধীন জাতি হিসেবে বাঙালির স্বীকৃতি ও প্রথম বিশ্ব অভিষেক।
দিনপঞ্জি:-
১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ পাকিস্তানি সৈন্যদের ভারত-বাংলাদেশ যৌথবাহিনীর নিকট আত্মসমর্পণ।২২ ডিসেম্বর ১৯৭১ অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের ঢাকা আগমণ।
২৪ জানুয়ারি ১৯৭২ বাংলাদেশ কলাবরেটর (স্পেশাল ট্রাইবুনাল) আইন, ১৯৭২ জারি।
০৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ ২৫ বছর মেয়াদী ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষর।
১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন।
১৭ মার্চ ১৯৭২ ভারতীয় বাহিনীর বাংলাদেশ ত্যাগ।
২৯ মার্চ ১৯৭২ পাকিস্তানি ১১০০ যুদ্ধবন্দীর যুদ্ধপরাধে বিচারের সম্মুখীন করার ঘোষণা।
০২ জুলাই ১৯৭২ সিমলা চুক্তি স্বাক্ষর।
০৪ নভেম্বর ১৯৭২ গণপরিষদে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন।
১৬ ডিসেম্বর ১৯৭২ বাংলাদেশের সংবিধান কার্যকর।
০৭ মার্চ ১৯৭৩ ১ম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান।
২০ জুলাই ১৯৭৩ আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনাল) আইন, ১৯৭৩ প্রণয়ন।
২৮ আগস্ট ১৯৭৩ পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে দিল্লী চুক্তি সম্পাদন।
০৬ সেপ্টেম্বর ১৯৭৩ জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনে যোগদান।
৩০ নভেম্বর ১৯৭৩ শর্তসাপেক্ষ দালাল আইনে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা।
২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪ ওআইসিভুক্ত ৭ সদস্যের ঢাকা আগমণ ও শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে আলোচনা।
২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪ পাকিস্তান কর্তৃক বাংলাদেশকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি দান।
০৯ এপ্রিল ১৯৭৪ দিল্লীতে ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তান ত্রিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষর।
১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ বাংলাদেশের জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ।









No comments:
Post a Comment